বুধবার ০১ জুলাই ২০২৬, ১৭ আষাঢ় ১৪৩৩

Logo
Add Image

বিভাগ : খুলনা || জেলা : যশোর

স্মৃতির কপোতাক্ষে নোনা জল, বাড়ির বারান্দায় চটের চটি: যশোরের বর্ষায় মায়াবী পুঁথিপাঠ

উবাঈদুল হুসাইন আল্ সামি, যশোর প্রতিনিধি:
আষাঢ়ের মেঘ তখন কেবলই ডানা মেলতে শুরু করেছে ভৈরব আর কপোতাক্ষের অববাহিকায়। টিনের চালে রিনিঝিনি বৃষ্টির নূপুর নিক্কন। মাঠের পর মাঠ পাটক্ষেত অথৈ জলে ডুবুডুবু। যশোরের গ্রামীণ জীবনে বর্ষা মানেই যেন এক অলস মায়ার চাদর। চাষির লাঙল জোয়াল আপাতত ঘরের কোণে বিশ্রাম নিচ্ছে, নিঝুম দুপুরে কিষানির হেঁশেল থেকে ভেসে আসছে খিচুড়ির সোঁদা গন্ধ। কিন্তু এই দীর্ঘমেয়াদি বর্ষার দিনে গাঁয়ের মানুষের মন তো আর ঘরে বন্দি থাকতে চায় না। আধুনিক যুগের ফেসবুক, ইউটিউব কিংবা টেলিভিশনের স্ক্রিন যখন নাগরিক মনকে গ্রাস করেছে, তখনও যশোরের চৌগাছা উপজেলার এড়োল বিল বেষ্টিত নিভৃত বাড়ীয়ালী, হাউলি, দুড়িয়ালী ও রাণীয়ালী পল্লী গ্রামে বর্ষা এলে বিশেষ করে হিন্দু বাড়ি থেকে ভেষে আসে অলৌকিক এক সুর।

 

গ্রামের কোনো এক বড় গৃহস্থের বারান্দায়, কিংবা বাড়ির কোন এক ঘরে পাটি বা চটের চটি বিছিয়ে বসে এক জাদুকরি আসর। হারানো সুরের সেই মায়াজালই হলো—পুঁথিপাঠ।

 

যশোরের চৌগাছা, ঝিকরগাছা, কেশবপুর কিংবা মণিরামপুরের কোনো এক প্রত্যন্ত গ্রামে ঢুকলে বর্ষার সন্ধ্যায় এখনো কানে আসতে পারে এক টানটান, দীর্ঘায়িত সুরের মূর্ছনা। পাঠক চশমাটা নাকের ডগায় নামিয়ে, টিমটিমে কুপি বা হ্যারিকেনের আলোয় (কিংবা এখনকার সোলার লাইটের মৃদু আভায়) মেলে ধরেছেন হলদে হয়ে যাওয়া প্রাচীন কোনো পুঁথির পাতা।

 

পুঁথিপাঠের এই আসর কোনো সাধারণ গল্প বলা নয়। এটি যেন এক জীবন্ত সুরের থিয়েটার। 'বেহুলা লকিন্দার' ‘আমির হামজা’, ‘হাতেম তাই’, ‘গাজী কালু চম্পাবতী’ কিংবা ‘কারবালা ও মহররমের কাহিনী’—এইসব পুঁথির ছত্রগুলো যখন এক বিশেষ ছন্দে ও সুরে গীত হতে থাকে, তখন উপস্থিত শ্রোতাদের নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসে।

 

পাঠক সুর করে পড়ছেন—"শোন শোন মমিনগণ করিয়া শ্রবণ, গাজী কালুর কেচ্ছা শুনো দিয়া মন..."


একটানা সুরে যখন বীরত্বের বর্ণনা আসে, তখন শ্রোতাদের চোখ চকচক করে ওঠে। আবার যখন কারবালার ময়দানে ইমাম হোসেনের পিপাসার্ত হৃদয়ের হাহাকার কিংবা চম্পাবতীর বিরহগাথা সুরের ডানা মেলে বাতাসে ভাসে, তখন আসরে বসা বৃদ্ধ চাষি কিংবা ঘোমটা টানা গ্রামীণ বধূটির চোখের কোণ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ে। বৃষ্টির শব্দ আর পুঁথিপাঠের করুণ সুর মিলেমিশে একাকার হয়ে যায় যশোরের এই মেঠো সন্ধ্যায়।

 

যশোরের এই পুঁথিপাঠের আসরগুলো কেবল বিনোদনের মাধ্যম নয়, এটি ছিল গ্রামীণ সম্প্রীতি ও সংস্কৃতির এক পরম মিলনমেলা। বর্ষায় যখন যাতায়াতের পথ বলতে শুধুই কাঁদা আর ডিঙি নৌকা, তখন এই আসরগুলোই ছিল মানুষের মনের খোরাক।

 

ডিঙি নৌকায় চেপে দূর-দূরান্তের গ্রাম থেকে মানুষ আসত পুঁথি শুনতে। তামাকের ধোঁয়া, মুড়ির মোয়া আর চা-এর আড্ডার মাঝে এই আসর চলত মধ্যরাত পর্যন্ত। বড়দের পাশাপাশি ছোট ছোট শিশু-কিশোররাও মন্ত্রমুগ্ধের মতো বসে থাকত। এই পুঁথিগুলোর ভাষা ছিল এক অদ্ভুত মিশ্রণ—যাকে বলা হয় ‘দোভাষী পুথি’। বাংলা শব্দের সাথে আরবি, ফারসি এবং যশোরের স্থানীয় আঞ্চলিক শব্দের এমন এক অপূর্ব মেলবন্ধন সেখানে থাকত, যা শুনলেই মনের ভেতর এক অন্যরকম নস্টালজিয়া তৈরি হয়।

 

রসালো প্রেমের কাহিনী থেকে শুরু করে ধর্মীয় উপাখ্যান, নৈতিক শিক্ষা কিংবা বীরত্বের কাহিনী—সবই উঠে আসত এই পুঁথির পাতায়। এটি ছিল গ্রামের নিরক্ষর মানুষের জন্য একাধারে ইতিহাস শিক্ষা আর বিনোদনের প্রধান উৎস।


হাউলী গ্রামের সত্তর উর্ধ সমরেশ বৈরাগী বলেন," কালের নিয়মে প্রযুক্তির আলো গ্রামীণ জীবনকেও বদলে দিয়েছে। এখন ঘরে ঘরে স্মার্টফোন, সস্তা ইন্টারনেট। বিনোদনের সংজ্ঞাই বদলে গেছে। ফলে যশোরের যে গ্রামে একসময় ঘরে ঘরে বর্ষায় পুঁথির আসর বসত, আজ তা অমাবস্যার চাঁদের মতোই বিরল।"

 

তিনি আরও বলেন, "পুরনো সেই পুঁথি পাঠক যারা ছিলেন, তাদের অনেকেই আজ প্রয়াত। নতুন প্রজন্ম এই সুর সাধনায় আর আগ্রহী নয়। হলদে হয়ে যাওয়া সেইসব সস্তা কাগজে ছাপা পুঁথির বইগুলো আজ হয়তো কোনো গৃহস্থের ঘরের মাচা বা সিন্দুকের কোণে উইপোকার খাদ্য হচ্ছে।"তবুও, শিকড়ের টান কি এত সহজে মোছা যায়?"

 

যশোরের সংস্কৃতিপ্রেমী প্রবীণ মানুষ হিন্দু, বোদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের অন্যতম নেতা মৃণাল কান্তি বলেন, "এখনো বর্ষা এলে আমাদের এড়োলের রাণীয়ালী গ্রামে এই আসর পুনরুজ্জীবিত করার চেষ্টা করা হয়। এখনো বর্ষার মেঘ থমথম করলে কপোতাক্ষের পাড়ের এই গ্রামে চণ্ডীমণ্ডপে বয়োবৃদ্ধরা একত্রিত হন।" 

 

তিনি আরও বলেন, *"স্মার্টফোনে গান শোনা যায় বাবা, কিন্তু পুঁথির সুরের মধ্যে যে বুক ফাটানো কান্না আর আনন্দ আছে, তা ওই মেশিনের বাক্সে পাওয়া যায় না।

 

যশোরের বর্ষাকালীন এই পুঁথিপাঠ আমাদের লোক সংস্কৃতির এক অমূল্য দলিল। মাইকেল মধুসূদন দত্তের এই চারণভূমিতে লোকায়ত সংস্কৃতির শিকড় অনেক গভীরে পোঁতা। যদি এই ঐতিহ্যকে আমরা ধরে রাখতে না পারি, তবে প্রযুক্তির জোয়ারে ভেসে যাবে আমাদের আত্মপরিচয়।

 

বর্ষার জল যেমন মাটিকে উর্বর করে, তেমনি এই পুঁথিপাঠের আসরগুলো মানুষের মনকে উর্বর করত, জাগিয়ে তুলত মানবিক মূল্যবোধ। সরকারি বা বেসরকারি উদ্যোগে যদি গ্রামীণ এই শিল্পীদের একটু পৃষ্ঠপোষকতা দেওয়া যেত, যদি ডিজিটাল মাধ্যমেও এই সুরগুলোকে সংরক্ষণ করা যেত, তবে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম জানতে পারত—তাদের পূর্বপুরুষেরা বর্ষার রাতে কতটা নান্দনিক ও কাব্যিক জীবন যাপন করতেন।

 

বাইরে তখনো ঝুমঝুম বৃষ্টি। কপোতাক্ষের জল উপচে পড়ছে ঘাটে। আর গ্রামের সেই অন্ধকার দাওয়ায় হ্যারিকেনের আলো কাঁপিয়ে প্রবীণ পুঁথি পাঠক শেষ টান দিচ্ছেন— "আজকে সায়র হইলো সারা, কলম লইলাম তুলি, কসুর মার্জনা করিও সবে, আমি অতি কূলি..."

 

আসরের সবাই এক দীর্ঘশ্বাস ফেলে উঠে দাঁড়ায়। বর্ষার রাত আরও গভীর হয়, আর বাতাসে রেশ থেকে যায় এক হারিয়ে যাওয়া শতাব্দীর মায়াবী সুরের।
 

সর্বশেষ

জনপ্রিয়

Logo

সম্পাদক : আবু তাহের

© ২০১৪-২০২৬ টাঙ্গাইল দর্পণ, অনলাইন নিউজ পেপার ২৪/৭