রবিবার ০৮ নভেম্বর ২০২৬, ২৪ কার্তিক ১৪৩৩
প্রকাশিত: ২০২৬-১১-০৭ ২২:০৮:১৪
উবাঈদুল হুসাইন আল্ সামি, যশোর প্রতিনিধি:
যশোরে একের পর এক ট্রেন দুর্ঘটনা ও প্রাণহানির নেপথ্যে উঠে এসেছে অরক্ষিত রেলক্রসিংয়ের ভয়াবহ চিত্র। জেলায় মোট ১৮৩টি রেলক্রসিংয়ের মধ্যে ১০১টিই অবৈধ। অন্যদিকে বৈধ ৮২টি ক্রসিংয়ের অবস্থাও সন্তোষজনক নয়; এগুলোর মধ্যে ৩৮টিতেই কোনো গেটম্যান নেই। ফলে অধিকাংশ পয়েন্টই থেকে যাচ্ছে চরম নিরাপত্তাহীনতায়। আর এই নিরাপত্তাহীনতাই প্রতিনিয়ত কেড়ে নিচ্ছে তাজা প্রাণ।
গত এক দশকে যশোর অঞ্চলে ৪৫টি রেল দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন ৭৫ জন। পঙ্গুত্ব বরণ করেছেন অনেকে। কিন্তু তারপরও বন্ধ হয়নি অবৈধ ক্রসিং, বাড়েনি গেটম্যান। বরং দিন দিন জনবসতি বাড়ার সাথে সাথে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে অনুমোদনহীন পারাপারের পথ।
সর্বশেষ গত ৪ নভেম্বর যশোরের ছোট মেঘলা রেলক্রসিংয়ে এক মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় এক ট্রাকচালক প্রাণ হারান। দ্রুতগামী ট্রেনের ধাক্কায় ট্রাকটির কেবিন বিচ্ছিন্ন হয়ে দুমড়েমুচড়ে যায়। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, গেটম্যান ও সিগন্যাল না থাকায় চালক বুঝতেই পারেননি ট্রেন আসছে।
এর আগে ২৬ সেপ্টেম্বর দুপুর ২টার দিকে যশোরের কৃষ্ণবাটিতে অবৈধ রেলক্রসিং পার হওয়ার সময় ট্রেনের ধাক্কায় দুমড়ে-মুচড়ে যায় যাত্রীবাহী একটি ইজিবাইক। এতে ঘটনাস্থলেই প্রাণ হারান দুইজন। আহত হন আরও কয়েকজন।
তার আগে ১০ মে অভয়নগরের ভাঙ্গা গেটে কয়লাবোঝাই একটি ট্রাককে ধাক্কা দিয়ে প্রায় আধা কিলোমিটার টেনে নিয়ে যায় ট্রেন। এতে প্রাণ যায় চালকের। পঙ্গুত্ব বরণ করেন তার সহকারী।
এছাড়াও সাম্প্রতিক সময়ে যশোরের বিভিন্ন স্থানে ট্রেনে কাটা পড়ে ও ট্রেন-যানবাহন সংঘর্ষে একাধিক হতাহতের ঘটনা ঘটেছে।
যশোর পৌরসভার দক্ষিণ অংশের খড়কি ধোপাপাড়া সড়কের মাঝ দিয়ে গেছে যশোর-কোটচাঁদপুর রেলপথ। অথচ এই ক্রসিংয়ে গেটম্যান নেই। সতর্কতামূলক নাম সর্বস্ব একটি সাইনবোর্ড থাকলেও তার লেখা অস্পষ্ট। ফলে ঝুঁকি নিয়ে পার হচ্ছে সব যানবাহন। একই চিত্র জেলার অধিকাংশ ক্রসিংয়ে।
রেলওয়ে সূত্রে জানা যায়, বেশিরভাগ অবৈধ ও বৈধ অরক্ষিত ক্রসিংয়ে নেই কোনো গেট বা সিগন্যাল ব্যবস্থা। নিয়মিত গেটম্যান না থাকায় যানবাহন ও পথচারীরা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ক্রসিং পার হচ্ছেন। অনেক জায়গায় গেট থাকলেও তা ভাঙা বা অকেজো।
চুরামনকাটি এলাকার গেটম্যান আরাফাত হোসেন বলেন, "আমরা গেট বন্ধ করতে গেলে অনেক সময় পথচারীদের হামলা ও বুলিংয়ের শিকার হই। অনেকে গেট ভেঙে পার হতে চায়। ট্রেন আসার সময়ও তারা তাড়াহুড়ো করে। আমাদের কথা কেউ শুনতে চায় না।"
যশোর ধর্মতলার স্থানীয় বাসিন্দা মাস-উদুর রহমান বলেন, "দিনদিন জনবসতি বাড়লেও বাড়েনি অনুমোদিত রেলক্রসিং। তাই প্রয়োজনের তাগিদে স্থানীয়রা নিজেরাই তৈরি করেছেন অবৈধ পারাপারের পথ, আর সেগুলোই এখন মরণফাঁদে পরিণত হয়েছে। রেললাইনের দুপাশে অবৈধভাবে জনবসতি গড়ে ওঠায় সংকট আরও বাড়ছে।"
তবে এসব অবৈধ ক্রসিংয়ের দায় নিতে নারাজ রেল কর্তৃপক্ষ। বাংলাদেশ রেলওয়ের পশ্চিমাঞ্চলের প্রধান প্রকৌশলী আহসান জাবির বলেন, "বিভিন্ন সময় এলজিইডির রাস্তা নির্মাণের ফলে অনুমোদনহীন লেভেল ক্রসিং বাড়ছে। অনুমতি না নিয়ে রেললাইনের ওপর দিয়ে রাস্তা তৈরি করা হচ্ছে।"
তিনি আরও বলেন, "অবৈধ ক্রসিংগুলো চিহ্নিত করা হয়েছে। পর্যায়ক্রমে এগুলো বৈধকরণ অথবা বন্ধের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। তবে এজন্য স্থানীয় প্রশাসন ও এলজিইডির সহযোগিতা প্রয়োজন।"
অন্যদিকে যশোর এলজিইডি কার্যালয়ের সিনিয়র সহকারী প্রকৌশলী আসিফ ইকবাল রাজিব বলেন, "গেটম্যান নিয়োগের জন্য রেল বিভাগকে বারবার জানিয়েও মেলেনি সমাধান। নতুন ক্রসিংয়ের অনুমোদন চাইলে ফাইল আটকে থাকে বছরের পর বছর।"
তিনি আরও বলেন, "রেল কর্তৃপক্ষ আমাদের কাছে সহযোগিতা চাইলে সড়কপথ ও রেলকে নিরাপদ করতে সব ধরনের সহযোগিতা করা হবে।"
বাংলাদেশ রেলওয়ে পশ্চিম অঞ্চলের অতিরিক্ত মহাব্যবস্থাপক এ.এম.এম শাহ্ নেওয়াজ বলেন, "নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আমরা নানা উদ্যোগ গ্রহণ করেছি, তবে আমাদের লোকবল কম। নতুন করে নিয়োগের বিষয়ে বোর্ড ও ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ ব্যবস্থা গ্রহণ করলে তা সম্ভব হবে। তার পাশাপাশি ডিজিটাল সিগন্যাল ও স্বয়ংক্রিয় গেট বসানোর বিষয়টিও বিবেচনায় আছে।"
বৃহত্তর যশোর রেল যোগাযোগ উন্নয়ন সংগ্রাম কমিটির অন্যতম সদস্য তসলিম-উর রহমান বলেন, "বিগত ১৫ দিনে শুধু যশোরের ঝিকরগাছার লাউজানি গেটে ৩টি দুর্ঘটনায় ৭ জন মারা গেছেন। জেলার ১৮৩টি রেলগেটের মধ্যে ১০১টি অরক্ষিত এবং ৮২টি বৈধ গেট রেল কর্তৃপক্ষ পরিচালনা করছে। গেটগুলোতে গেটম্যান না থাকা এবং সড়ক ও রেল মন্ত্রণালয়ের সমন্বয়হীনতার কারণে যত্রতত্র গেট ও রাস্তা তৈরি হচ্ছে, যার কারণে দুর্ঘটনার শিকার হয়ে মৃত্যু ঘটছে। এগুলো সাধারণ মৃত্যু বা দুর্ঘটনা নয়, বরং কাঠামোগত হত্যা করা হচ্ছে। এই হত্যাকাণ্ডের দায় রাষ্ট্র তথা রেল, এলজিইডি এবং সড়ক মন্ত্রণালয়কে নিতে হবে।"
তিনি আরও বলেন, "অরক্ষিত ক্রসিং ও অবকাঠামোগত ঘাটতির পাশাপাশি চালক ও পথচারীদের অসচেতনতাও এসব দুর্ঘটনার মূল কারণ। রেলক্রসিং পারাপারের সময় অসাবধানতা এবং সংকেত না মেনে তাড়াহুড়ো করে পার হওয়ার প্রবণতার কারণে প্রতিনিয়ত ঘটছে দুর্ঘটনা। অনেকে কানে হেডফোন দিয়ে, মোবাইলে কথা বলতে বলতে লাইন পার হন।"
দ্রুত অবৈধ ক্রসিংগুলো বৈধকরণের পাশাপাশি সব পয়েন্টে গেটম্যান নিয়োগ ও ডিজিটাল সিগন্যাল ব্যবস্থা চালুর জোর দাবি জানাচ্ছেন তিনি। একইসঙ্গে চালক ও পথচারীদের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধিতে কঠোর আইনি পদক্ষেপ ও প্রচারণার তাগিদ দিয়েছেন তিনি।
অবৈধ ক্রসিং বন্ধ ও নিরাপদ পারাপার নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট সব দপ্তরকে সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা। তাদের কথা, আর কত প্রাণ গেলে টনক নড়বে কর্তৃপক্ষের?