শুক্রবার ৩০ অক্টোবর ২০২৬, ১৫ কার্তিক ১৪৩৩
প্রকাশিত: ২০২৬-১০-২৯ ১৭:০২:৪৭
উবাঈদুল হুসাইন আল্ সামি, যশোর প্রতিনিধি:
নিত্যপণ্যের বাজারে চড়া সবজির দাম। যশোরের বিভিন্ন বাজারে উচ্চ দামে বিক্রি হচ্ছে প্রায় সব ধরনের শাকসবজি। অথচ উৎপাদন খরচের তুলনায় ফসলের ন্যায্যমূল্য পাচ্ছেন না কৃষকেরা। মাঠ থেকে ভোক্তার হাতে পৌঁছাতে কয়েক দফা হাতবদলে সবজির দাম বাড়লেও সেই বাড়তি দামের সুফল পাচ্ছেন না উৎপাদকেরা।
দক্ষিণাঞ্চলের অন্যতম প্রধান শস্য ও সবজি উৎপাদনকারী জেলা যশোরে এবার শীতকালীন ও বারোমাসি সবজির ভালো ফলন হয়েছে। তবে উৎপাদন খরচের তুলনায় কম দাম পাওয়ায় হতাশ কৃষকেরা। মাঠ থেকে খুচরা বাজারে পৌঁছাতে সবজির দাম তিন থেকে চার গুণ পর্যন্ত বেড়ে যাচ্ছে বলে দাবি সংশ্লিষ্টদের। অথচ এই মূল্যবৃদ্ধির বড় অংশ কৃষকের হাতে পৌঁছাচ্ছে না।
স্থানীয় বাজার ঘুরে দেখা গেছে, যশোরের সাতমাইল, চূড়ামনকাটি, চৌগাছা, বাঁকড়া, অভয়নগর ও মণিরামপুরের বিভিন্ন হাটে ফুলকপি, বাঁধাকপি, মুলা, বেগুন ও শিম কেজিপ্রতি ৩৫ থেকে ৪০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। অথচ যশোর শহরের খুচরা বাজারে এসব সবজি কেজিপ্রতি ৮০ থেকে ১৩০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। লাউ, করলা ও পটলের ক্ষেত্রেও একই চিত্র দেখা গেছে বলে স্থানীয়দের ভাষ্য।
ছাতিয়ানতলা গ্রামের কৃষক পরাগ হোসেন বলেন, বর্তমান বাজারে বীজ, সার, কীটনাশক, সেচ ও দিনমজুরের খরচ অনেক বেড়েছে। এক বিঘা জমিতে সবজি চাষে যে খরচ হয়, মাঠের পাইকারি দামে তা ওঠানো কঠিন। অনেক সময় জমি থেকে সবজি তুলে বাজারে নেওয়ার পরিবহন খরচও ওঠে না।
চৌগাছা উপজেলার সিংহঝুলির জামালতা গ্রামের সবজি চাষি বিল্লাল হোসেন বলেন, “আমরা ভোররাত থেকে জমিতে কাজ করি। অথচ সবজি বিক্রি করতে গিয়ে ন্যায্য দাম পাই না। বাধ্য হয়ে অনেক সময় কম দামেই বিক্রি করতে হয়। শহরের মানুষ সেই সবজি চড়া দামে কিনছেন। আমাদের পরিশ্রমের লাভ চলে যাচ্ছে মধ্যস্বত্বভোগীদের পকেটে।” তিনি আরও বলেন, কৃষকেরা নিজেরা উৎপাদন করলেও পাইকারি বাজারে সবজির দাম নির্ধারণে তাঁদের ভূমিকা কম। ফড়িয়ারা যে দাম নির্ধারণ করেন, অনেক সময় সেই দামেই সবজি বিক্রি করতে বাধ্য হন তাঁরা।
সদর উপজেলার মানিকদিহী গ্রামের মধ্যস্বত্বভোগী শরিফুল ইসলাম বলেন, “আমরা সরাসরি কৃষকদের কাছ থেকে সবজি কিনে আড়তদারদের কাছে বিক্রি করি। কেজিতে ১৫ থেকে ২০ টাকা লাভ থাকে। তবে গাড়িভাড়া, শ্রমিকের খরচ, খাজনা ও পচনজনিত ক্ষতি বাদ দিলে সেই টাকা দিয়ে পরিবার চালাতে হয়। মৌসুমে লাভ না হলে সারা বছর চলা কঠিন।”
চূড়ামনকাটি কাঁচাবাজারের আড়তদার জসিমউদ্দীন বলেন, “আমরা যে দামে কিনি, সামান্য খরচ ও লাভ যোগ করে সেই অনুযায়ী বিক্রি করি।”
যশোর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক (ভারপ্রাপ্ত) জাহিদুল ইসলাম বিশ্বাস বলেন, উৎপাদন এলাকা থেকে খুচরা বাজার পর্যন্ত একাধিকবার হাতবদলের কারণে সবজির দাম বেড়ে যায়। পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধির অজুহাতে কোথাও কোথাও দাম বাড়ানো হয়। নিয়মিত বাজার তদারকি এবং সংরক্ষণের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা না থাকায় কৃষকেরা অনেক সময় কম দামে ফড়িয়াদের কাছে সবজি বিক্রি করতে বাধ্য হন।
যশোর জেলা সিনিয়র কৃষি বিপণন কর্মকর্তা কিশোর কুমার শাহা বলেন, কৃষকদের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে তাঁদের দপ্তর কাজ করছে। কৃষকেরা অভিযোগ জানালে বড় বাজারের ব্যবসায়ীদের সঙ্গে তাঁদের যোগাযোগ করিয়ে দেওয়া হয়। তিনি আরও বলেন, “পচনশীল পণ্যে ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত পচন বা ড্যামারেজ হতে পারে। সরকারি নিয়ম অনুযায়ী ব্যবসায়ীরা নির্দিষ্ট মার্জিনে লাভ করতে পারেন। মধ্যস্বত্বভোগীরা অন্যায্য কিছু করছেন—এমন সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পেলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
উৎপাদন খরচের তুলনায় ন্যায্যমূল্য না পেলে কৃষকেরা ভবিষ্যতে সবজি চাষে আগ্রহ হারাতে পারেন। এতে কৃষি উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি বাজারে সবজির সরবরাহেও প্রভাব পড়তে পারে। তাই কৃষকের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে বাজার তদারকি জোরদার, সংরক্ষণব্যবস্থার উন্নয়ন এবং উৎপাদক থেকে ভোক্তা পর্যন্ত মূল্যবৃদ্ধির কারণ অনুসন্ধানের দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।