শুক্রবার ১৭ এপ্রিল ২০২৬, ৪ বৈশাখ ১৪৩৩

Logo
Add Image

জেলা খবর

ঐতিহ্যবাহী টাঙ্গাইল শহরের ২৭টি খাল আজ বিলুপ্তির পথে: উদ্ধারের পথ খুঁজছে পাউবো 

প্রকাশিত: ২০২৬-০৪-১৭ ১০:১৯:৩৭

News Image

-মহিউদ্দিন সুমন
দখল বাণিজ্য, দূষণ আর অযত্নে টtঙ্গাইল শহরের ২৭টি খাল এখন বিলুপ্তির পথে। এ খালগুলোর সাথে টাঙ্গাইল শহরের বুক চিরে লৌহজং নদী প্রবাহিত ছিল। তবে টা সময়ের সাথে বদলে গেছে সেই চিত্র। অবৈধ দখলের ফলে বেশ কয়েকটি খালের অস্তিত্ব বিলীন হয়ে গেছে। এই খালগুলো উদ্ধার করে শহরের নাব্যতা ফিরিয়ে আনার পথ খুঁজছে পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো)।

 

শহরের মাঝখান দিয়ে প্রবাহিত শ্যামাবাবুর খালটি ড্রেনে পরিণত হয়েছে। ময়লা আবর্জনায় ভাগাড়ে পরিণত হয়েছে। দীর্ঘদিন পরিষ্কার না করায় দুর্গন্ধে নাক ঢেকে চলতে হয় পথচারীর। সব মিলিয়ে ভয়াবহ পরিবেশ বিপর্যয়ের আশঙ্কা করছেন পরিবেশবিদরা। বিলুপ্ত খাল পুনরুজ্জীবিত করতে হলে লৌহজং নদী দখলমুক্ত ও পুনঃখননের মধ্যদিয়ে স্বাভাবিক পানি প্রবাহের ব্যবস্থা করতে হবে।

 

সরেজমিনে দেখা যায়, টাঙ্গাইল সদর উপজেলার কাশিনগর এলাকায় লৌহজং নদীর উৎসমুখ। যার উৎপত্তি ধলেশ্বরী থেকে। প্রায় ৭৬ কিলোমিটার দীর্ঘ নদী শহরের বুক চিরে জেলার মির্জাপুর উপজেলার বংশাই নদীতে মিলিত হয়েছে। নব্বইয়ের দশকে পানি উন্নয়ন বোর্ড পাইলট প্রকল্পের আওতায় লৌহজং নদীর উৎসমুখে স্লুইজ গেট নির্মাণ করে। এরপর থেকেই নদীর উৎসমুখে পলি ও বালি জমতে থাকে। একই সাথে কমতে থাকে পানির স্বাভাবিক প্রবাহ। ফলে দখল আর দূষণের কবলে পড়ে নদীটি। এভাবে গত কয়েক দশকে অনেকটা মরা নদীতে পরিণত হয় লৌহজং। লৌহজংয়ের সাথে সংযুক্ত খালগুলোও অস্তিত্ব হারাতে বসেছে।

 

জেলা প্রশাসকের কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, ২০১৬ সালে তৎকালীন জেলা প্রশাসন পৌর এলাকার হাজরাঘাট থেকে বেড়াডোমা পর্যন্ত লৌহজং এর দেড় কিলোমিটার জায়গা দখলমুক্ত করার উদ্যোগ নেয়। কিছু অবৈধ স্থাপনা অপসারণ করা হলেও পরে অজ্ঞাত কারণে উচ্ছেদ কার্যক্রম স্থগিত হয়ে যায়। সেসময় পরিবেশবাদী সংগঠনগুলো বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের কাগজপত্র, সিএস, আরএস ইত্যাদি ঘেঁটে অন্তত ২৭টি খালের সন্ধান পায়। 

 

বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতি (বেলা)’র জরিপ ও পরিসংখ্যানে দেখা যায়, টাঙ্গাইল পৌরসভার ১৮টি ওয়ার্ডের মধ্যে ১০, ১২, ১৩ ও ১৬ নং ওয়ার্ডে কোনো খাল নেই। বাকি ১৪টি ওয়ার্ডে ২৭টি খালের অস্তিত্ব পাওয়া গেছে। ১ নং ওয়ার্ডের দেওলা থেকে কান্দিলা, ২ নং ওয়ার্ডের এনায়েতপুর থেকে বৈল্যা হাটখোলা হয়ে হাজরাঘাট, ৩ নং ওয়ার্ডের কাগমারা থেকে বেড়াডোমা, ৪ নং ওয়ার্ডের বেড়াডোমা, দিঘুলিয়া, পাড় দিঘুলিয়া, লৌহজং নদী থেকে সারটিয়া, ৫ নং ওয়ার্ডের সাকরাইল থেকে সন্তোষ, ৬ নং ওয়ার্ডের লৌহজং নদী থেকে বাকা মিয়ার ব্রিজ, ৭ নং ওয়ার্ডে লৌহজং নদী থেকে সন্তোষ লাল ব্রিজ, ৮ নং ওয়ার্ডে সন্তোষ, মাদারখোলা থেকে এলাসিন রোড জোড়া ব্রিজ, ৯ নং ওয়ার্ডে অলোয়া ভবানী ও অলোয়া তারিণী লৌহজং নদী থেকে এলাসিন রোডের জোড়া ব্রিজ, ১১ নং ওয়ার্ডে বেড়াবুচনা পানির ট্যাংক থেকে লৌহজং নদী, ১৪ নং ওয়ার্ডে বাঁকা মিয়ার ব্রিজ থেকে খাদ্যগুদামের পাশের ব্রিজ, ১৫ নং ওয়ার্ডে খাদ্যগুদাম থেকে বেতকা সুতার পাড়া, ১৭ নং ওয়ার্ডে সুতার পাড়া থেকে বোরাই বিল পর্যন্ত একটি এবং মুন্সিপাড়া মসজিদ থেকে প্রাইমারি স্কুল পর্যন্ত, ১৮ নং ওয়ার্ডে সাবালিয়া বটতলা থেকে টাঙ্গাইল জেনারেল হাসপাতাল ও জেনারেল হাসপাতাল থেকে কোদালিয়া শেষ সীমানা পর্যন্ত একটি খাল রয়েছে।

 

বেলার গবেষণা কর্মকর্তা গৌতম চন্দ্র জানান, শহরের ২৭টি খালের বিষয়ে জেলা প্রশাসনকে অনেক আগেই অবহিত করা হয়েছে। অন্যদিকে নদী, খাল, বিল ও জলাশয় উদ্ধারে মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা রয়েছে।

 

সরেজমিনে দেখা যায়, শহরের সাবালিয়া খালটি ময়মনসিংহ সড়কের বায়তুন নূর জামে মসজিদের পাশ থেকে সাবালিয়া পাঞ্জাপাড়া হয়ে বটতলা কালভার্ট হয়ে বৈরান নদীতে সংযোগ ছিল। কিন্তু প্রভাবশালী মহল প্রথমে ময়লা আবর্জনা ফেলে কৌশলে ভরাট করে। পরে সীমানা প্রাচীর গড়ে তোলার পর তা ভেঙে বহুতল ভবন নির্মাণ করেছে। একই কায়দায় অন্যান্য খালগুলো দখল করেছে প্রভাবশালী মহল। এদিকে ভয়াবহ অবস্থা শহরের সেন্ট্রাল ড্রেনের।
 
স্থানীয়রা জানান, বিন্দুবাসিনী উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষক শ্যামাচরণ গুপ্ত পৌর পরিষদের ভাইস চেয়ারম্যান থাকার সময় পয়োনিষ্কাশন ও স্থানীয় নৌ-যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নে ১৯০৫ সালে প্যারাডাইস পাড়ায় লৌহজং নদী থেকে বিশ্বাস বেতকা বুরাই বিল পর্যন্ত খাল খনন করেন। স্থানীয়দের কাছে খালটি শ্যামাবাবুর খাল হিসেবে পরিচিত। স্বাধীনতার পরেও ৩৫ থেকে ৪০ ফুট চওড়া খাল দিয়ে যাত্রী ও পণ্যবাহী নৌকা চলাচল করতো। নব্বই দশকে পানি উন্নয়ন বোর্ড কম্পার্টমেন্টালাইজেশন পাইলট প্রকল্পের আওতায় উৎসমুখ থেকে গোডাউন সেতু পর্যন্ত প্রায় দেড় কিলোমিটার ড্রেন নির্মাণ করে। ১৯৯৬ সালে ওই ড্রেনের ওপর একাধিক মার্কেট নির্মাণ করে পৌর কর্তৃপক্ষ। এভাবে মৃত্যু হয় শ্যামবাবুর খাল।

 

মওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্স অ্যান্ড রিসোর্স ম্যানেজমেন্টের প্রফেসর ড. এএসএম সাইফুল্লাহ বলেন, প্রাকৃতিক ড্রেনেজ সিস্টেম বন্ধ হয়ে যাওয়ায় জলাভূমি ও ড্রেনেজ সিস্টেম ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এছাড়া ভূমির যে গঠন ও প্রকৃতি রয়েছে তাও পরিবর্তন হয়ে যাচ্ছে। যা মানব সভ্যতার জন্য এক বড় বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।

 

খাল দখল করে ড্রেন নির্মাণ করা হয়েছে। প্রচুর ধুলার কারণে অ্যাজমাসহ বিভিন্ন রোগ বৃদ্ধি পাচ্ছে। ফলে ভয়াবহ পরিবেশ বিপর্যয়ের আশঙ্কা রয়েছে।  

 

জেলা নাগরিক অধিকার সুরক্ষা কমিটির সাধারণ সম্পাদক ইঞ্জিনিয়ার নুর মোহাম্মদ রাজ্য বলেন, কাগমারী পুরাতন ব্রিজের (লালব্রীজ) একশ’ মিটার উত্তর থেকে পশ্চিমে প্রবাহিত গইজাবাড়ি খালটি কালিপুর, পালপাড়া, সন্তোষ, সাকরাইল, ঘোড়ামারা ও বিন্নাফৈর হয়ে ধলেশ্বরীর সাথে এবং সন্তোষের অংশ রথখোলা হয়ে অলোয়া লৌহজং নদীতে সংযুক্ত হয়েছে। প্রায় ১৭ কিলোমিটার এ খালটি খনন করা গেলে পরিবেশের বিপর্যয়ের হাত থেকে রক্ষা পাবে দক্ষিণ টাঙ্গাইলের মানুষ।

 

টাঙ্গাইল পৌরসভার প্রশাসক মাহফুজুল আলম মাসুম বলেন, নূতন করে আর কোনো খাল যাতে দখল না হয় তার জন্য ব্যবস্থা নেয়া হবে। সরকারের খাল খনন ও পুনরুদ্ধারের বিষয়ে নির্দেশনা পেলে তা বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেয়া হবে। 

 

টাঙ্গাইল পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো)’র নির্বাহী প্রকৌশলী মাঈন উদ্দিন জানান, ইতোমধ্যে টাঙ্গাইল সদর উপজেলার গালা খাল, বিন্নাফৈর খাল ও সন্তোষ খাল খনন ও উদ্ধারের তালিকা পাঠানো হয়েছে। 

 

ইতোমধ্যে টাঙ্গাইলের ধলেশ্বরী ও লৌহজং নদী পুনঃখনন এবং নদী তীর সংরক্ষণ কাজের ছয়টি প্যাকেজে প্রায় ৪৭ কোটি ৯৫ লাখ টাকার দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে। আমরা আশা করছি দ্রুত সময়ের মধ্যে কাজগুলো শুরু করতে পারবো। 
 

Logo
Logo





Logo

আরো পড়ুন

Logo

সম্পাদক : আবু তাহের

© ২০১৪-২০২৬ টাঙ্গাইল দর্পণ, অনলাইন নিউজ পেপার ২৪/৭