সোমবার ১৭ আগস্ট ২০২৬, ২ ভাদ্র ১৪৩৩
প্রকাশিত: ২০২৬-০৮-১৭ ২৩:১০:৩৯
জুয়েল রানা, সখীপুর (টাঙ্গাইল) প্রতিনিধি:
একদিন যে মানুষটি পরিবারের সুখের আশায় হাজার মাইল দূরে সৌদি আরবে পাড়ি জমিয়েছিলেন, জীবনের শেষ সময়ে সেই মানুষটিকেই পাওয়া গেল রাস্তার পাশে অসুস্থ ও অসহায় অবস্থায়। বৃষ্টিভেজা রাতে পড়ে থাকা সেই জামাল উদ্দিনকে ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তৈরি হয়েছিল তীব্র আলোচনা। উঠেছিল নানা প্রশ্ন! কে তাঁর পাশে দাঁড়াবে, কীভাবে হবে তাঁর চিকিৎসা, আর কেনই বা জীবনের এমন কঠিন সময়ে তাঁকে রাস্তার পাশে পড়ে থাকতে হলো?
শেষ পর্যন্ত সেই প্রশ্নগুলোর উত্তর না দিয়েই চলে গেলেন জামাল উদ্দিন।
সোমবার (১৭ আগস্ট) বিকেল ৩টার দিকে টাঙ্গাইলের সখীপুর উপজেলার কালমেঘা এলাকায় ভাতিজি ইসমত আরার বাড়িতে তার মৃত্যু হয়। জামাল উদ্দিন (৪৯) কালমেঘা গ্রামের ফজর আলীর ছেলে। প্রায় ২৫ বছর আগে নিজ গ্রাম ছেড়ে তিনি গাজীপুরের শ্রীপুর উপজেলার বাশবাড়ি দক্ষিণপাড়া, ইয়ার উদ্দিন মোড় এলাকায় শ্বশুরবাড়িতে বসবাস শুরু করেন। সংসার ও পরিবারের ভবিষ্যতের কথা ভেবে জীবিকার সন্ধানে পাড়ি জমান সৌদি আরবে। সেখানে প্রায় ১২ বছর কাজ করেন।
গত ২ আগস্ট রাতে উপজেলার কালমেঘা এলাকায় স্থানীয়রা তাঁকে অসুস্থ অবস্থায় রাস্তার পাশে পড়ে থাকতে দেখেন। এর আগে ১ আগস্ট দিবাগত রাতে তাঁকে তাঁর পৈতৃক ভিটার পাশের সড়কে ফেলে যাওয়ার অভিযোগ ওঠে স্ত্রী ও সস্তানদের বিরুদ্ধে। স্থানীয়রা তাঁকে উদ্ধার করে কালমেঘা গ্রামের তাঁর ভাতিজি ইসমতারার বাড়িতে আশ্রয়ের ব্যবস্থা করেন। ঘটনাটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর মুহূর্তেই মানুষের মধ্যে তৈরি হয় ব্যাপক আলোচনা ও সহানুভূতি।
গত ৬ আগস্ট এলাকাবাসীর আর্থিক সহায়তায় তাকে সখীপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয়। সেখানে প্রায় এক সপ্তাহ চিকিৎসাধীন থাকার পর গত শুক্রবার (১৫ আগস্ট) তাকে ভাতিজির বাড়িতে নিয়ে আসা হয়। সেখানে সোমবার তাঁর মৃত্যু হয়।
এদিকে রাস্তায় ফেলে যাওয়ার পর প্রায় দুই সপ্তাহ পেরিয়ে গেলেও স্ত্রী ও সন্তানরা তার খেঁাজ নেননি বলে স্থানীয়দের অভিযোগ। অন্যদিকে জামাল উদ্দিনের স্ত্রী রিনা আক্তারের দাবি, তিনি কয়েক মাস আগে স্বামীকে ডিভোর্স দিয়েছেন। তাঁর সঙ্গে এখন আর কোনো সম্পর্ক নেই।
প্রবাসের কঠিন জীবন, পরিশ্রম আর উপার্জনের পেছনে ছিল পরিবারের মুখে হাসি ফোটানোর স্বপ্ন। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সেই স্বপ্নে নেমে আসে অন্ধকার। কয়েক বছর আগে কিডনিসহ বিভিন্ন জটিল রোগে আক্রান্ত হন জামাল উদ্দিন। অসুস্থতার কারণে প্রায় আট মাস আগে সৌদি আরব থেকে দেশে ফিরে আসেন তিনি। এরপর থেকেই শুরু হয় তাঁর জীবনের সবচেয়ে কঠিন সময়।
ঘটনার পর বিষয়টি উপজেলা প্রশাসনের নজরেও আসে। প্রশাসনিক উদ্যোগ, স্থানীয়দের সহায়তায় কিংবা মানুষের সহানুভূতি কোনোটিই শেষ পর্যন্ত জামাল উদ্দিনকে বাঁচিয়ে রাখতে পারল না। সোমবার বিকেলে তাঁর মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়তেই আবারও আলোচনায় আসে সেই রাতের ঘটনা। তবে এবার আর তিনি নেই। নেই তাঁর নিজের মুখে শেষ সময়ের কথা বলার সুযোগ। কীভাবে তিনি রাস্তায় এলেন, শেষ দিনগুলো কীভাবে কাটল, কে বা কারা তাঁর পাশে ছিলেন এসব প্রশ্নের অনেক উত্তর হয়তো আর কোনোদিন জানা যাবে না।
একজন মানুষ যখন জীবনের শেষ প্রান্তে এসে দাঁড়ান, তখন তাঁর পরিচয়ের চেয়ে বড় হয়ে ওঠে তাঁর অসহায়ত্ব। তখন তিনি কার স্বামী, কার বাবা, কার ভাই তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে তিনি একজন মানুষ। জামাল উদ্দিন চলে গেলেন। কিন্তু তাঁর রেখে যাওয়া প্রশ্নগুলো রয়ে গেল পরিবার, সমাজ, আমাদের প্রত্যেকের কাছে। শেষ সময়ে একজন অসুস্থ মানুষের ওষুধের চেয়েও বেশি প্রয়োজন ছিল একটু আশ্রয়ের, একটু যত্ন আর পাশে একজন মানুষের। জামাল উদ্দিন সেই অপেক্ষা আর নেই। জামাল উদ্দিন জানিয়ে গেলেন, মানুষের জীবনে সবচেয়ে বড় সম্পদ কখনো টাকা নয়, শেষ সময়ে পাশে থাকার মতো একজন মানুষ।