বৃহস্পতিবার ০৬ আগস্ট ২০২৬, ২২ শ্রাবণ ১৪৩৩

Logo
Add Image

জাতীয়

‘আদিবাসী’ শব্দের রাজনীতি বন্ধ করে সমান কোটা ও আয়কর সুবিধার দাবিতে পিসিসিপির বিক্ষোভ

প্রকাশিত: ২০২৬-০৮-০৭ ০০:২৫:৫৩

News Image

স্টাফ রিপোর্টার: 
‘আদিবাসী’ শব্দের ব্যবহারকে ঘিরে রাজনৈতিক বিতর্ক বন্ধ, পার্বত্য চট্টগ্রামের সকল জাতি-গোষ্ঠীর (বাঙালিসহ) জন্য শিক্ষা ও চাকরিতে সমান কোটা, সমান আয়কর সুবিধা এবং সমঅধিকার নিশ্চিত করার দাবিতে বিক্ষোভ সমাবেশ করেছে পার্বত্য চট্টগ্রাম ছাত্র পরিষদ (পিসিসিপি), ঢাকা মহানগর শাখা।


বৃহস্পতিবার (৬ আগস্ট, ২০২৬) বিকেল ৩টায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজু ভাস্কর্যের পাদদেশে অনুষ্ঠিত  পিসিসিপি ঢাকা মহানগর শাখার সভাপতি রাসেল মাহমুদের সভাপতিত্বে এবং সাধারণ সম্পাদক রিয়াজুল হাসানের সঞ্চালনায় সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্য দেন অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল হাসিনুর রহমান।

 

বিশেষ অতিথির বক্তব্য রাখেন- পার্বত্য চট্টগ্রাম সমিতি ঢাকা’র সভাপতি, লেখক, গবেষক ও সিনিয়র সাংবাদিক এ এইচ এম ফারুক, পিসিসিপির কেন্দ্রীয় সহ-সভাপতি আল আমিন, স্টুডেন্টস ফর সভারেন্টির আহ্বায়ক জিয়াউল হক, পিসিসিপির প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ইঞ্জিনিয়ার শাহাদাৎ ফরাজি সাকিব এবং সিএইচটি সম্প্রীতি জোটের আহ্বায়ক থোয়াই চিং মং শাকসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক ও ছাত্র সংগঠনের নেতারা।

 

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) হাসিনুর রহমান বলেন, পার্বত্য জেলা পরিষদে হস্তান্তরিত বিভাগগুলোর নিয়োগে স্বচ্ছতা ও মেধার ভিত্তিতে নিয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি পার্বত্য অঞ্চলের বাঙালি শিক্ষার্থীদের জন্য উচ্চশিক্ষায় পৃথক কোটার ব্যবস্থা করার দাবি জানান তিনি।

 

ব্রিগেডিয়ার হাসিনুর আরও বলেন- ১৯৯৭ সালের পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তিতে সংশ্লিষ্ট জনগোষ্ঠীর ক্ষেত্রে ‘উপজাতি’ শব্দ ব্যবহৃত হলেও পরবর্তী সময়ে ‘আদিবাসী’ পরিচয়ের ব্যবহার বৃদ্ধি পেয়েছে। তাদের দাবি, এ বিষয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য রয়েছে এবং রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব ও জাতীয় নিরাপত্তার প্রশ্নে সরকারকে সতর্ক থাকতে হবে।

 

বিশেষ অতিথির বক্তব্যে পার্বত্য চট্টগ্রাম সমিতি, ঢাকা-এর সভাপতি, লেখক, গবেষক ও সিনিয়র সাংবাদিক এ এইচ এম ফারুক বলেন- পার্বত্য চট্টগ্রামের কতিপয় উপজাতিদের ‘আদিবাসী’ শব্দ ব্যবহারের আন্তর্জাতিক চক্রান্ত এবং এর পেছনের গভীর ভূ-রাজনৈতিক নীল নকশা রয়েছে। আমরা সকলেই জানি, ১৯৭২ সালে মিস্টার লারমা যে বিতর্ক তুলে সশস্ত্র গেরিলা যুদ্ধের মাধ্যমে বিদ্রোহ করেছিল তা দীর্ঘ আলোচনা প্রক্রিয়ার পর ১৯৯৭ সালে ‘পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি’ স্বাক্ষরের মাধ্যমে অবসান হয়েছে। 

 

তিনি বলেন- চুক্তির মূল পাঠ পরীক্ষা করলে আমরা দেখি, চুক্তির ‘ক’ খণ্ডের ১ নং ধারায় পুরো অঞ্চলকে ‘উপজাতি অধ্যুষিত অঞ্চল’ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। পুরো ৭২টি ধারার মধ্যে অন্তত ৫০ বার ‘উপজাতি’ শব্দটি অত্যন্ত স্পষ্টভাবে ব্যবহৃত হয়েছে। জনসংহতি সমিতির শীর্ষ নেতা জ্যোতিঁরিন্দ্র বোধিপ্রিয় লারমা (সন্তু লারমা) ও তার প্রতিনিধিরা সম্পূর্ণ সজ্ঞানে ও আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে ‘উপজাতি’ পরিচয়েই এই চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছিলেন। পরবর্তীতে এই চুক্তির আলোকেই পার্বত্য জেলা পরিষদ আইন-১৯৯৮, পার্বত্য আঞ্চলিক পরিষদ আইন-১৯৯৮ এবং পার্বত্য ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন গঠন করা হয়—যেখানে আইনিভাবে ‘উপজাতি’ শব্দটিই প্রতিষ্ঠিত।

 

আজ প্রায় ৩ দশক ধরে যে নেতৃত্ব এবং তাদের প্রতিনিধিরা রাষ্ট্রের প্রতিমন্ত্রীর মর্যাদায় আঞ্চলিক পরিষদের চেয়ারম্যান পদসহ সব ধরনের রাষ্ট্রীয় সুবিধা ভোগ করে আসছেন, তারাই আজ আবার আন্তর্জাতিক মঞ্চে নিজেদের ‘আদিবাসী’ দাবি করছেন! এটি কেবল এক চরম স্ববিরোধিতা নয়, বরং আইনি ও নৈতিক দিক থেকেও গ্রহণযোগ্য নয়।

 

২০০৭ সালে জাতিসংঘ সনদ (UNDRIP) ঘোষণার পর থেকে ‘উপজাতি’ বনাম ‘আদিবাসী’ শব্দগত নতুন এই বিতর্ক সামনে এনেছেন পাকিস্তানের আমৃত্যু উজিরে খামাখা, রাঙ্গামাটির সাবেক চাকমা সার্কেল চিফ বাংলাদেশের কুখ্যাত রাজাকার ত্রিদিব রায়ের পুত্র ব্যারিস্টার দেবাশীষ রায়। আজকে আমাদের ভেবে দেখতে হবে—কেন তারা নিজেদের সাংবিধানিক পরিচয় অস্বীকার করে ‘আদিবাসী’ শব্দটির জন্য মরিয়া?

 

এ এইচ এম ফারুক আরও বলেন- পার্বত্য চট্টগ্রাম বাংলাদেশের অবিচ্ছেদ্য অংশ। সাংবিধানিক ও ঐতিহাসিকভাবে এখানকার ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠী আমাদের ভাই-বোন এবং তারা আমাদের জাতীয় পরিচয়ের অন্যতম অংশ। কিন্তু ‘আদিবাসী’ শব্দের আড়ালে রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব, অখণ্ডতা এবং জাতীয় নিরাপত্তা নিয়ে কোনো ধরনের ষোড়যন্ত্র এদেশের সচেষ্ট নাগরিকরা বরদাশত করবে না। আসুন আন্তর্জাতিক প্রোপাগান্ডা ও তথাকথিত ‘আদিবাসী’ দাবির পেছনের রাজনৈতিক মতলব সম্পর্কে আমরা নিজেরা সচেতন হই এবং দেশের সার্বভৌমত্ব সুরক্ষায় ঐক্যবদ্ধ ভূমিকা রাখি।

 

স্টুডেন্টস ফর সভারেন্টির আহ্বায়ক জিয়াউল হক বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তিতে ‘উপজাতি’ শব্দ ব্যবহৃত হলেও বর্তমানে ‘আদিবাসী’ পরিচয়ের দাবি উত্থাপন করা হচ্ছে। জাতীয় ঐক্য ও রাষ্ট্রের অখণ্ডতা রক্ষায় সবাইকে সচেতন থাকার আহ্বান জানান তিনি।

 

পিসিসিপির কেন্দ্রীয় সহ-সভাপতি আল আমিন বলেন, ঐতিহাসিক তথ্য ও বিভিন্ন গবেষণার ভিত্তিতে পার্বত্য অঞ্চলের জনগোষ্ঠীর ইতিহাস নিয়ে আলোচনা প্রয়োজন বলে তারা মনে করেন। তিনি এ বিষয়ে বিভিন্ন গবেষক ও লেখকের মতামতেরও উল্লেখ করেন।

 

সভাপতির বক্তব্যে রাসেল মাহমুদ বলেন, পার্বত্য অঞ্চলের পরিচয়-রাজনীতির বিষয়টি জাতীয় স্বার্থের সঙ্গে সম্পৃক্ত। এ বিষয়ে সংবিধান ও রাষ্ট্রীয় নীতির আলোকে সমাধান খুঁজে বের করার আহ্বান জানান তিনি।

 

অন্যান্য বক্তারা বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামে দীর্ঘদিন ধরে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর জন্য বিদ্যমান আয়কর অব্যাহতির সুবিধা স্থানীয় বাঙালি জনগোষ্ঠীর ক্ষেত্রেও সমানভাবে প্রযোজ্য হওয়া উচিত। একই সঙ্গে জেলা পরিষদে হস্তান্তরিত বিভাগের তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির (১১-২০তম গ্রেড) পদে স্বচ্ছ ও মেধাভিত্তিক নিয়োগ নিশ্চিত করা এবং পার্বত্য বাঙালি শিক্ষার্থীদের জন্য উচ্চশিক্ষায় পৃথক কোটা চালুর দাবিও জানানো হয়।

 

বক্তারা আরও বলেন, ১৯৯৭ সালের পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি এবং পরবর্তী সংশ্লিষ্ট আইনগুলোতে ‘উপজাতি’ শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে। তাঁর দাবি, পরবর্তীতে ‘আদিবাসী’ পরিচয়ের বিষয়টি আন্তর্জাতিক পরিসরে নতুনভাবে সামনে এসেছে। রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব ও সাংবিধানিক কাঠামো রক্ষায় এ বিষয়ে সতর্ক থাকার আহ্বান জানান তিনি।

 

পরে সমাবেশ থেকে তিন দফা দাবি উত্থাপন করা হয়। দাবিগুলো হলো—

১. ‘আদিবাসী’ শব্দের আড়ালে দেশভাগ ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির যেকোনো ষড়যন্ত্র প্রতিরোধে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ।

২. পার্বত্য চট্টগ্রামের সকল জাতি-গোষ্ঠীর (বাঙালিসহ) জন্য শিক্ষা ও চাকরিতে সমান কোটা নিশ্চিত করা।

৩. পার্বত্য অঞ্চলে বসবাসকারী সকল নাগরিকের জন্য বৈষম্যহীন ও সমান আয়কর ব্যবস্থা চালু করা।
 

Logo
Logo





Logo

আরো পড়ুন

Logo

সম্পাদক : আবু তাহের

© ২০১৪-২০২৬ টাঙ্গাইল দর্পণ, অনলাইন নিউজ পেপার ২৪/৭