বুধবার ২০ মে ২০২৬, ৬ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩
প্রকাশিত: ২০২৬-০৫-২০ ২১:১৭:১১
উবাঈদুল হুসাইন আল্ সামি, যশোর প্রতিনিধি:
শুষ্ক মৌসুমে অধিকাংশ খালই পানিশূন্য হয়ে পড়েছে। ফলে কৃষকদের ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরতাই একমাত্র পথ। যা সেচ ব্যয় বৃদ্ধি ও পরিবেশগত ঝুঁকি তৈরি করছে। অন্যদিকে এই খাল বর্ষায় হয়ে পড়বে পানি ‘নিষ্কাসনের নালা’! তৈরি করবে জলাবদ্ধতা।যশোরে কয়েক কোটি টাকা ব্যয়ে পুনঃখনন করা বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশনের (বিএডিসি) খালগুলো বছরের বেশিরভাগ সময় জুড়ে পানিশূন্য থাকছে। ফলে ভূ-উপরিস্থ পানি দিয়ে কম খরচে কৃষিকাজে সেচের সুবিধা নিশ্চিতের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য ব্যাহত হচ্ছে। এ ছাড়া নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ ও সংস্কারের অভাবে অল্পকিছুদিনের মধ্যেই খাল ভরাট হয়ে যাচ্ছে। ফলে ভরাট খাল দিয়ে পানি বের হতে না পারায় বিস্তীর্ণ ফসলি জমি জলাবদ্ধতায় অনাবাদি থাকছে।
কৃষকেরা জানান, শুষ্ক মৌসুমে ধু-ধু করে খাল। ফলে সেচের ক্ষেত্রে কোনো কাজে আসে না। তবে, যে সব খালের তলদেশ পুরোপুরি ভরাট হয়নি, বর্ষা মৌসুমে সেগুলো দিয়ে পানি নিষ্কাশন হওয়ায় উপকৃত হন।এদিকে, নদী-খাল-বিল রক্ষার আন্দোলনে সম্পৃক্তদের ভাষ্য, এসব সেচখাল এখন ‘পানি নিষ্কাশনের’ নালায় পরিণত হয়েছে। পরিবেশবিদ ও পরিবেশ আন্দোলন কর্মীরা বলছেন, পানির উৎস অর্থাৎ নদ-নদী তথা প্রাকৃতিকভাবে সৃষ্ট জলাধারের সঙ্গে এসব খালের বেশিরভাগের সংযোগ না থাকায় খালগুলোয় পানিপ্রবাহ নেই। ফলে যে লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য নিয়ে এগুলো খনন ও পুনঃখনন করা, সেটি পূরণ হচ্ছে না।বিএডিসি সূত্রে জানা গেছে, যশোরে গত সাত-আট বছরে ১১ কোটি ৬১ লাখ টাকা ব্যয়ে ৩১টি খালের ৯৬ দশমিক ৭৫ কিলোমিটার পুনঃখনন করা হয়েছে। প্রতি কিলোমিটার পুনঃখননে ১২ লাখ টাকা ব্যয় হয়েছে। ‘বৃহত্তর খুলনা-যশোর জেলা ক্ষুদ্রসেচ উন্নয়ন প্রকল্প’র আওতায় এই পুনঃখনন সম্পন্ন হয়। এ ছাড়াও নতুন করে আরও ৭৫ দশমিক ৫ কিলোমিটার খাল পুনঃখননের প্রস্তাবনা সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। এ ক্ষেত্রে প্রতি কিলোমিটার খননে সম্ভাব্য ব্যয় নির্ধারণ করা হয়েছে ১৪ লাখ টাকা।
সরেজমিনে যশোরের চৌগাছা উপজেলার দুটি ইউনিয়ন- ফুলসারা ও পাশাপোলের ৮ কিলোমিটার জুড়ে থাকা বাওটির খালের তলদেশে বিস্তর পানি দেখা গেছে। শ্যাওলা, ঘাস ও কাদাপানিতে ভর্তি খালটি। স্থানীয় কৃষকেরা জানান, পাঁচ-ছয় বছর আগে খালটি পুনঃখনন করে বিএডিসি। কিন্তু খননের পর কোনোদিনই খালটিতে সেচের জন্য পর্যাপ্ত পানি থাকেনি। উল্টো কয়েক বছর পর খালটির তলদেশ ভরাট হয়ে যায়। আর তারপরই শুরু হয়েছে জলাবদ্ধতার দুর্ভোগ।স্থানীয় কৃষক নূরুল ইসলাম বলেন, মূল খালটি খনন করা হলেও এর সঙ্গে সংযুক্ত আরও আটটি খালের একটিও পুনঃখনন করা হয়নি। এমনকি বাওটার খাল খননের পর রক্ষণাবেক্ষণ ও সংস্কারের অভাবে তলদেশ ভরাট হয়ে গেছে। যার কারণে জগন্নাথপুর, ফুলসারা, সলুয়া, বাড়িয়ালি, হাউলি ও দশপাখিয়ার বিস্তীর্ণ ফসলি মাঠ বর্ষা মৌসুমে পানির তলে থাকে। এতে আবাদ মার যায়।দেখা গেছে, পাশাপোল ইউনিয়নের বিল এড়োর খালেরও জীর্ণদশা। ফলে শুষ্ক মৌসুমে ধু-ধু করে এই খাল। খালটির তলদেশ কাদামাটি জমে ভরাট হয়ে গেছে। স্থানীয় কৃষকেরা জানান, ভরাটখাল দিয়ে বর্ষা মৌসুমে পানি বের হয় না। ফলে রানিয়ালি, কালিয়াকুন্ডি, বিল এড়োর ও বড়গোবিন্দপুরের ফসলের মাঠ তলিয়ে যায়। এতে হাজার হাজার বিঘা জমি অনাবাদি থাকে।
দুড়িয়ালি গ্রামের কৃষক খাইরুল ইসলাম বলেন, ‘দুড়িয়ালির এড়োর খালটি প্রায় ৫০ বছর আগে খনন করা হয়েছিল। তখন এটি এলাকার জন্য আশীর্বাদ ছিল। কিন্তু এখন পলি জমে প্রায় ভরাট হয়ে গেছে। সামান্য বৃষ্টি হলেই আশপাশের জমি তলিয়ে যায়। আগে যেটা উপকারে আসত, এখন সেটাই গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
একই এলাকার কৃষক হরিপদ বিশ্বাস বলেন, একটু বৃষ্টি হলেই সব ফসল পানিতে তলিয়ে যায়। এই এড়োর খাল দিয়ে মোট ১৮টি মৌজার পানি বের হয়। কিন্তু খালের গভীরতা হারিয়ে যাওয়ায় এখন তা আমাদের জন্য সমস্যার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। পানি উন্নয়ন বোর্ড ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ দ্রুত ব্যবস্থা নিলে আমরা কৃষকেরা অনেক উপকৃত হব।
কৃষক জয়দেব হালদার বলেন, ‘দীর্ঘদিন ধরে এই বাওটির খাল ভরাট হয়ে আছে। বর্ষা এলেই আমরা আতঙ্কে থাকি। খালটি পুনঃখনন হলে পানি দ্রুত নেমে যাবে, ফসল রক্ষা পাবে। কৃষির জন্য খুবই জরুরি।’বিল এড়োর এলাকার কালিয়াকুন্ডি গ্রামের কৃষক আলী রেজা রাজু বলেন, ‘বাড়ির পাশের খাল থেকে পূর্বপুরুষেরা স্যালোমেশিন দিয়ে পানি তুলে জমিতে সেচ দিতেন। তখন জমি ফলন দিত ভরপুর। কিন্তু গত ৫০ বছরে খালটি আর খনন না হওয়ায় গভীরতা হারিয়েছে। এখন হাজার হাজার বিঘা জমির আবাদ হুমকির মুখে। একটু বৃষ্টি হলেই পানি নেমে যেতে পারে না, ফসল নষ্ট হয়ে যায়। কৃষকের দুঃখের শেষ থাকে না।’
কৃষকদের ভাষ্য, শুধু খনন করে চলে গেলেই হবে না। রক্ষণাবেক্ষণ ও সংস্কার করতে হবে। তা না হলে অল্পদিনের মধ্যেই খাল ভরাট হয়ে ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়।সরেজমিনে ঘুরে দেখা গেছে, যশোরে বিএডিসির বেশিরভাগ খাল পানিশূন্য। কোনো কোনো খালে পানি থাকলেও একদমই তলদেশে; যেখান থেকে পানি উত্তোলন করে সেচ সম্ভব না। কিছু কিছু খালে সেচপাম্প থাকলেও বেশিরভাগেই নেই। অধিকাংশ খালসংলগ্ন জমিতে ডিপটিউবওয়েল ও অগভীর নলকূপের মাধ্যমে ভূ-গর্ভের পানি তুলে কৃষিসেচ চলে।যশোরে পুনঃখনন করা খালের কয়টিতে বিএডিসির পাম্প আছে, সেই তথ্য চাইলে কোনো তথ্য-পরিসংখ্যান দিতে পারেনি বিএডিসির জেলা কার্যালয়। কার্যালয় সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানিয়েছেন, অধিকাংশ খালেই বছরভর পানি থাকে না। যার কারণে সেচপাম্প খুব বেশি একটা নেই। খালগুলো একমাত্র পানি নিষ্কাশনেই ব্যবহৃত হয়।যশোর সদরের দেয়াড়া ও চুড়ামনকাটি ইউনিয়নের জাউদিয়া গ্রাম সংলগ্ন রাজাকাটা খাল সংলগ্ন জমিতে চাষাবাদকারী কৃষকেরা জানান, খালটি বছরখানেক আগে খনন করা হয়। বছরভর পানি না থাকায় সেচের কোনো কাজে আসে না। তবে, খালটি পুনঃখনন হওয়ার আগে যে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হতো, সেটি এখন আর হয় না।স্থানীয় কৃষক রবিউল ইসলাম বলেন, ‘বছরখানেক আগে রাজাকাটা খালটি পুনঃখনন করা হয়। কিন্তু বর্ষা মৌসুমবাদে বেশিরভাগ সময় খাল পানিশূন্য থাকে। তিনি বলেন, পানি না থাকায় এখানকার কয়েক হাজার বিঘা জমির মালিকেরা নলকূপ দিয়ে ভূ-গর্ভের পানি তুলে সেচ দেন। সেচের কাজে লাগে না এই খাল।’আরেক কৃষক গফুর উদ্দিন বিশ্বাস বলেন, ‘খনন করে বিএডিসি চলে যায়। পরে কোনো সংস্কার করে না। যার কারণে খাল ভরাট হয়ে যায়। তখন খাল দিয়ে পানি বের হতে না পারায় বিলের জমি পানিতে ডুবে থাকে। এতে ফসল আবাদ ব্যাহত হয়।’
বাংলাদেশের বিপ্লবী কমিউনিস্ট লীগের জেলা সম্পাদক ও ভবদহ পানি নিষ্কাশন সংগ্রাম কমিটির উপদেষ্টা তসলিম উর রহমান বলেন, ভূ-গর্ভের পানি তুলে কৃষিকাজে সেচ অনেক ব্যয়বহুল। এর বদলে ভূ-উপরিভাগের পানি ব্যবহার করা গেলে ব্যয় সাশ্রয় হতো। কিন্তু খাল-বিলে পর্যাপ্ত পানি না থাকায় সেটি সম্ভব হচ্ছে না। তিনি বলেন, খালে পানি থাকার বিষয়টি নদ-নদীতে পানি থাকা না থাকার সঙ্গে সম্পৃক্ত। আর তাই খালে পানিপ্রবাহ চাইলে নদ-নদী খনন ও বিদ্যমান খালের সঙ্গে সেগুলোর উৎস্যমুখের সংযোগ ঘটাতে হবে। তা না হলে খালে পানি থাকবে না। এ জন্য নদ-নদী খনন দরকার।তিনি আরও বলেন, খাল পুনঃখননে অনেক টাকা ব্যয় হচ্ছে। কিন্তু এই খনন কোনো কাজে আসছে না। কারণ, খালে পানি না থাকায় সেচ দেওয়া যায় না। বলতে গেলে- খালগুলো শুধুমাত্র বিলে জমে থাকা পানি বের হওয়ার কাজে ব্যবহার হচ্ছে। যেটি ড্রেনেজ সিস্টেমের কাজ করছে।
ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগের সাবেক শিক্ষক অধ্যাপক ছোলজার রহমান জানান, যশোরে বহুসংখ্যক খাল আছে। খননের পর আর কখনও সংস্কার করা হয়নি। এসব খালের নদী বা বাঁওড়ের সঙ্গে সংযোগ নেই। পলি জমে খাল নাব্যতা হারিয়ে ফেলেছে। এগুলোকে নদী বা বাঁওড়ের সঙ্গে যুক্ত করা যায়, তাহলে পরিবেশ ও বাংলাদেশের অর্থনৈতিকভাবে ব্যাপক রাখবে।তিনি বলেন, ‘যশোরের সিংহভাগ সেচ ভূগর্ভস্থ পানি দিয়ে চালানো হয়। ভূগর্ভস্থ পানির অতি ব্যবহারে পানির স্তর নেমে যায় এবং পানিতে আর্সেনিক আয়রনসহ অন্য উপাদান বেড়ে যায়। যা মানব দেহের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর। খালগুলোয় যদি পানি সংরক্ষণ করা যায়, তাহলে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর স্বাভাবিক থাকবে। খালের পানিতে প্রচুর পরিমাণ পলি-জৈবপদার্থ থাকায় সারের চাহিদা কমে আসবে। খরচ কম হবে ফসলের গুণগত মান ভালো হবে।’বিএডিসি যশোর রিজিয়নের নির্বাহী প্রকৌশলী মাজহারুল ইসলাম জানান, খননের পর রক্ষণাবেক্ষণে বাজেট থাকে না। কৃষকেরা বর্ষা মৌসুমে খালে পাট জাগ দেওয়ার সময় মাটি ব্যবহার করেন। সেগুলো খালের তলদেশে জমে ভরাট হয়ে যায়।
ভূ-উপরিস্থ পানির ব্যবহার বাড়িয়ে ভূ-গর্ভের পানির ব্যবহার হ্রাসের উদ্দেশ্যে খাল খনন করে বিএডিসি। খালে পানি না থাকায় সেটি ব্যাহত হচ্ছে- এ ব্যাপারে দৃষ্টি আকর্ষণ করলে তিনি জানান, শুধু সেচ নয়, পানি নিষ্কাশনও খাল খননের আরেকটি উদ্দেশ্য।