শুক্রবার ১৬ অক্টোবর ২০২৬, ১ কার্তিক ১৪৩৩
প্রকাশিত: ২০২৬-১০-১৬ ১৫:২৩:১৫
-পুষ্টিবিদ লিনা আকতার
খাবার আমাদের বেঁচে থাকা, সুস্থ থাকা ও শরীরের পুষ্টির চাহিদা পূরণের প্রধান উৎস। কিন্তু সেই খাবারই যদি জীবাণু, ক্ষতিকর রাসায়নিক বা অন্য কোনো দূষিত উপাদানে আক্রান্ত হয়, তাহলে তা স্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। খাদ্যদূষণের কারণে ডায়রিয়া, বমি, পেটব্যথাসহ নানা ধরনের অসুস্থতা দেখা দিতে পারে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, দূষিত খাবার থেকে ২০০টিরও বেশি ধরনের রোগ হতে পারে। তাই নিরাপদ খাবার নিশ্চিত করা জনস্বাস্থ্য রক্ষার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শর্ত।
বাংলাদেশে খাদ্য উৎপাদন, প্রক্রিয়াজাতকরণ, সংরক্ষণ ও বিক্রির পরিধি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করার গুরুত্বও বাড়ছে। এ ক্ষেত্রে খাদ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান, ব্যবসায়ী, খাদ্যকর্মী, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এবং ভোক্তা—সবারই দায়িত্ব রয়েছে।
খাদ্যনিরাপত্তা কেন গুরুত্বপূর্ণ?
খাদ্যনিরাপত্তা বলতে এমন ব্যবস্থা বোঝায়, যার মাধ্যমে খাবার উৎপাদন, প্রস্তুত, সংরক্ষণ ও পরিবহনের প্রতিটি ধাপে দূষণ প্রতিরোধ করা হয়। নিরাপদ খাবার মানুষের স্বাস্থ্য সুরক্ষার পাশাপাশি খাদ্যশিল্পের প্রতি ভোক্তার আস্থা বাড়ায়।
বাংলাদেশে নিরাপদ খাদ্য আইন, ২০১৩ প্রণয়ন করা হয়েছে। এই আইনে নিরাপদ খাদ্যের প্রাপ্যতা নিশ্চিত করতে খাদ্য উৎপাদন, আমদানি, প্রক্রিয়াকরণ, মজুত, সরবরাহ ও বিক্রয়সংক্রান্ত কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ ও তদারকির বিধান রয়েছে। এ বিষয়ে কাজ করে বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ।
খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করার ৮টি উপায়:
১. খাদ্যনিরাপত্তার আইন ও মানদণ্ড অনুসরণ
খাদ্য উৎপাদন ও বিপণনের সঙ্গে যুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোকে বাংলাদেশের প্রচলিত খাদ্যনিরাপত্তা আইন ও বিধিমালা মেনে চলতে হবে। পাশাপাশি আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত খাদ্যনিরাপত্তা নির্দেশনাও অনুসরণ করা প্রয়োজন।
খাদ্য উৎপাদনের বিভিন্ন ধাপে সম্ভাব্য ঝুঁকি শনাক্ত ও নিয়ন্ত্রণের জন্য হ্যাজার্ড অ্যানালাইসিস অ্যান্ড ক্রিটিক্যাল কন্ট্রোল পয়েন্টস (HACCP) পদ্ধতি ব্যবহার করা যায়। এ পদ্ধতিতে খাবার কোথায় দূষিত হতে পারে, তা চিহ্নিত করে ঝুঁকি কমানোর ব্যবস্থা নেওয়া হয়।
২. পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা
খাদ্য তৈরির স্থান, রান্নাঘর, যন্ত্রপাতি ও কাজের জায়গা নিয়মিত পরিষ্কার করতে হবে। খাবার প্রস্তুতের আগে ও পরে সাবান দিয়ে হাত ধোয়া, নিরাপদ পানি ব্যবহার এবং প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম পরিষ্কার রাখা জরুরি। পাশাপাশি ময়লা-আবর্জনা সঠিকভাবে অপসারণ করতে হবে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার খাদ্যনিরাপত্তা নির্দেশনায় পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা এবং খাবার প্রস্তুতের সময় স্বাস্থ্যবিধি অনুসরণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
৩. খাদ্যকর্মীদের প্রশিক্ষণ দেওয়া
খাদ্য উৎপাদন, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও পরিবেশনের কাজে যুক্ত কর্মীদের নিয়মিত প্রশিক্ষণ দিতে হবে। তাঁদের ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতা, নিরাপদে খাবার ধরার নিয়ম এবং খাদ্যদূষণ প্রতিরোধের উপায় সম্পর্কে জানতে হবে।
কাঁচা মাছ, মাংস ও ডিমের সংস্পর্শে আসা হাত, ছুরি বা কাটার বোর্ড পরিষ্কার না করে অন্য খাবারে ব্যবহার করা উচিত নয়। কারণ, এর মাধ্যমে ক্ষতিকর জীবাণু এক খাবার থেকে অন্য খাবারে ছড়িয়ে পড়তে পারে।
৪. সঠিক তাপমাত্রায় রান্না ও সংরক্ষণ
খাবার ভালোভাবে রান্না করা এবং উপযুক্ত তাপমাত্রায় সংরক্ষণ করা খাদ্যনিরাপত্তার অন্যতম শর্ত। বিশেষ করে মাছ, মাংস, ডিম ও দুধজাতীয় খাবার যথাযথভাবে রান্না করতে হবে। দ্রুত পচনশীল খাবার দীর্ঘ সময় স্বাভাবিক তাপমাত্রায় ফেলে রাখা উচিত নয়।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্দেশনা অনুযায়ী, অধিকাংশ খাবার নিরাপদ রাখতে রান্নার সময় ভেতরের তাপমাত্রা যথাযথ পর্যায়ে পৌঁছানো জরুরি। সাধারণভাবে ৭০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা অনেক খাবারে ক্ষতিকর জীবাণুর ঝুঁকি কমাতে সহায়তা করে। খাবারের ধরন অনুযায়ী নিরাপদ রান্নার তাপমাত্রা ভিন্ন হতে পারে।
রান্না করা খাবার ও কাঁচা খাবার আলাদা রাখা এবং দ্রুত পচনশীল খাবার প্রয়োজন অনুযায়ী ফ্রিজে সংরক্ষণ করাও জরুরি।
৫. নিরাপদ কাঁচামাল ও পানি ব্যবহার
খাবার তৈরির জন্য ভালো মানের কাঁচামাল এবং নিরাপদ পানি ব্যবহার করতে হবে। ফলমূল ও শাকসবজি পরিষ্কার পানিতে ভালোভাবে ধুয়ে নিতে হবে। পচা, দুর্গন্ধযুক্ত বা দূষিত কাঁচামাল ব্যবহার করা যাবে না।
নির্ভরযোগ্য সরবরাহকারীর কাছ থেকে কাঁচামাল সংগ্রহ এবং সরবরাহের সময় সেগুলোর মান পরীক্ষা করা জরুরি। নিরাপদ পানি ও উপযুক্ত কাঁচামাল ব্যবহার খাদ্যদূষণ প্রতিরোধের গুরুত্বপূর্ণ উপায়।
৬. নিরাপদ মোড়ক ও সঠিক সংরক্ষণব্যবস্থা
খাদ্যপণ্যের মোড়ক এমন হতে হবে, যাতে ধুলাবালি, আর্দ্রতা, জীবাণু ও অন্যান্য দূষিত উপাদান খাবারে প্রবেশ করতে না পারে। খাবারের ধরন অনুযায়ী উপযুক্ত তাপমাত্রা ও আর্দ্রতায় সংরক্ষণ করতে হবে।
মোড়কজাত খাবারে উৎপাদনের তারিখ, মেয়াদোত্তীর্ণের তারিখ, উপাদান এবং সংরক্ষণের নির্দেশনা স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা প্রয়োজন। মেয়াদোত্তীর্ণ বা মোড়ক ক্ষতিগ্রস্ত খাবার বিক্রি ও গ্রহণ করা থেকে বিরত থাকতে হবে।
৭. উৎপাদন ও মান নিয়ন্ত্রণের তথ্য সংরক্ষণ
খাদ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে কাঁচামাল সংগ্রহ, উৎপাদন, সংরক্ষণ, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ও মান পরীক্ষার তথ্য সংরক্ষণ করতে হবে। কোনো সমস্যা দেখা দিলে তার কারণ শনাক্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে।
নিয়মিত পরিদর্শন ও নথিপত্র সংরক্ষণের মাধ্যমে খাদ্যনিরাপত্তার ঘাটতি চিহ্নিত করা সহজ হয়। এতে একই ধরনের সমস্যা বারবার ঘটার ঝুঁকিও কমানো সম্ভব।
৮. ভোক্তার সচেতনতা বাড়ানো
খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ভোক্তারও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। খাবার কেনার সময় উৎপাদন ও মেয়াদোত্তীর্ণের তারিখ দেখতে হবে। মোড়ক ক্ষতিগ্রস্ত, অস্বাভাবিক ফুলে ওঠা বা খাবারের গন্ধ ও রং সন্দেহজনক হলে তা কেনা উচিত নয়।
রাস্তার খাবার খাওয়ার সময় পরিবেশের পরিচ্ছন্নতা, খাবার ঢেকে রাখা হয়েছে কি না এবং নিরাপদ পানি ব্যবহার করা হচ্ছে কি না, সেদিকেও নজর দিতে হবে। বাসায় খাবার তৈরির সময় হাত ধোয়া, কাঁচা ও রান্না করা খাবার আলাদা রাখা এবং খাবার সঠিকভাবে সংরক্ষণের অভ্যাস গড়ে তোলা প্রয়োজন।
পরিশেষে বলতে পারি যে,নিরাপদ খাবার নিশ্চিত করা শুধু ব্যক্তিগত সুস্বাস্থ্যের জন্য নয়, বরং জনস্বাস্থ্য রক্ষা ও খাদ্যশিল্পের উন্নয়নের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। এ জন্য খাদ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান, ব্যবসায়ী, খাদ্যকর্মী, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ও ভোক্তাদের সম্মিলিতভাবে দায়িত্ব পালন করতে হবে।
আইন মেনে চলা, পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা, নিরাপদ কাঁচামাল ব্যবহার এবং সঠিকভাবে রান্না ও সংরক্ষণের মাধ্যমে খাদ্যদূষণের ঝুঁকি কমানো সম্ভব। মনে রাখতে হবে, নিরাপদ খাবার নিশ্চিত করতে উৎপাদন থেকে ভোক্তার পাতে পৌঁছানো পর্যন্ত প্রতিটি ধাপেই সতর্কতা প্রয়োজন।
তথ্যসূত্র:
১. বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ: নিরাপদ খাদ্য সম্পর্কিত আইন ও বিধিমালা।
bfsa.gov.bd
২. নিরাপদ খাদ্য আইন, ২০১৩: বাংলাদেশের আইনবিষয়ক সরকারি ওয়েবসাইট।
bdlaws.minlaw.gov.bd
৩. বাংলাদেশ খাদ্য মন্ত্রণালয়: জাতীয় খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তা নীতি, ২০২০ এবং কর্মপরিকল্পনা ২০২১–২০৩০।
mofood.gov.bd
৪. বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা: খাদ্যনিরাপত্তা ও খাদ্যবাহিত রোগ সম্পর্কিত নির্দেশনা।
who.int
৫. বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা: নিরাপদ খাবারের পাঁচটি মূলনীতি—পরিচ্ছন্নতা, কাঁচা ও রান্না করা খাবার আলাদা রাখা, ভালোভাবে রান্না করা, নিরাপদ তাপমাত্রায় সংরক্ষণ এবং নিরাপদ পানি ও কাঁচামাল ব্যবহার।
-পুষ্টিবিদ লিনা আকতার
রাইয়ান হেলথ কেয়ার হসপিটাল এন্ড রিসার্চ সেন্টার, দিনাজপুর।