বুধবার ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১ আশ্বিন ১৪৩৩
প্রকাশিত: ২০২৬-০৯-১৬ ১৫:২২:৩৭
উবাঈদুল হুসাইন আল্ সামি, যশোর প্রতিনিধি:
বিশেষ প্রতিবেদন:গোধূলির আলো আঁধারে মিলিয়ে গিয়ে যখন প্রান্তিক গ্রামবাংলায় নিস্তব্ধতা নেমে আসে, তখন যশোরের বিল আর জলাশয়ের মেঠোপথে নীরবে জ্বলে ওঠে এক জোড়া জ্বলজ্বলে চোখ। এরা জলজ বাস্তুতন্ত্রের নীরব পাহারাদার -মেছো বিড়াল (Fishing Cat)। দূর থেকে এদের দেখে বাঘের বাচ্চা ভেবে ভুল করলেও প্রাণিবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে এরা চতুর ও লাজুক স্বভাবের একটি বুনো প্রাণী। স্থানীয়ভাবে এরা 'মেছো বাঘ', 'বাগধোড়া', 'বাগডাসা' কিংবা ভুলবশত 'ভাম' নামে পরিচিত। একসময় যশোরের বিস্তীর্ণ অববাহিকায় এদের অবাধ বিচরণ থাকলেও বর্তমানে প্রাকৃতিকভাবে বাসস্থান ধ্বংস, নগরায়ণ এবং মানুষের অন্ধ আতঙ্কের বলি হয়ে প্রাণীটি বিলুপ্তির মুখে দাঁড়িয়েছে।
যশোরের নিচু প্লাবনভূমি এবং নদ-নদীঘেরা পরিবেশ মেছো বিড়ালের প্রজনন ও বিচরণের জন্য শতক ধরে আদর্শ জায়গা ছিল। বিশেষ করে যশোর সদর, চৌগাছা, ঝিকরগাছা এবং ভারত সীমান্তসংলগ্ন শার্শা উপজেলার বিস্তৃত বিল ও নদীঘেরা বাঁশঝাড় ছিল এদের প্রাকৃতিক অভয়ারণ্য।
চিত্রা, ইচ্ছামতী ও কপোতাক্ষ নদের অববাহিকা এদের খাদ্যের মূল উৎস সরবরাহ করত। তবে বিগত দুই দশকে অবকাঠামোগত পরিবর্তন ও পরিবেশের অবক্ষয় এই চিত্র বদলে দিয়েছে। জনসংখ্যা বৃদ্ধির ফলে জলাশয় ও ডোবা ভরাট, বাণিজ্যিক মৎস্যচাষের জন্য বাঁধ নির্মাণ এবং নির্বিচারে বাঁশঝাড় উচ্ছেদের কারণে মেছো বিড়ালের মুক্ত চলাচলের পথ রুদ্ধ হয়ে পড়েছে। ফলে বাধ্য হয়ে খাদ্যের খোঁজে লোকালয়ে এসে মানুষ ও অকালমৃত্যুর মুখোমুখি হচ্ছে এরা।
গায়ের ডোরাকাটা ছোপের কারণে সাধারণ মানুষ প্রায়শই এদের চিতাবাঘ বা বাঘের বাচ্চা ভেবে আতঙ্কিত হয়ে পড়ে। মেছো বিড়াল অত্যন্ত লাজুক ও নিশাচর প্রাণী; এটি কখনোই মানুষকে আগে আক্রমণ করে না। অথচ লোকালয়ে দেখা মাত্রই 'বাঘ এসেছে' গুজনে চারপাশ উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। গত কয়েক মাসে চৌগাছা, শার্শা, ঝিকরগাছা ও যশোর সদরে অন্তত ১১টি মেছো বিড়ালকে পিটিয়ে, বিষটোপ দিয়ে কিংবা বিদ্যুতায়িত করে নির্মমভাবে হত্যা করাহয়েছে। নিহত কয়েকটি স্ত্রী মেছো বিড়ালের দুগ্ধপোষ্য বাচ্চাও মায়ের অভাবে অনাহারে মারা গেছে, যা এদের বংশবৃদ্ধির ধারাকে মারাত্মক হুমকির মুখে ফেলেছে।
মেছো বিড়াল প্রকৃতি ও জলজ বাস্তুতন্ত্রের ভারসাম্য রক্ষাকারী এক গুরুত্বপূর্ণ ‘সূচক প্রজাতি’ (Indicator Species)। মেছো বিড়ালের খাদ্যতালিকায় মাছের পাশাপাশি রয়েছে ইঁদুর, ক্ষতিকারক পোকামাকড়, ব্যাং ও সাপের বাচ্চা—যা ফসলের ক্ষেতে প্রাকৃতিক ‘বায়োলজিক্যাল পেস্ট কন্ট্রোল’ হিসেবে কাজ করে। এছাড়া জলাশয়ের অসুস্থ বা সংক্রামিত মাছ শিকার করে এরা মাছের রোগ ছড়ানো রোধ করে। ফলে এদের বিলুপ্তিতে গোটা জলজ পরিবেশ ও কৃষি ব্যবস্থা ধসে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বাংলাদেশের ‘বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) আইন, ২০১২’ অনুযায়ী মেছো বিড়াল একটি সংরক্ষিত প্রাণী এবং এটি হত্যা বা ধরা জামিনঅযোগ্য অপরাধ। তবে বাস্তবে এই আইনের প্রয়োগ দৃশ্যমান নয়। স্থানীয়দের অভিযোগ, কোনো প্রাণী লোকালয়ে আটকে পড়লে খবর দেওয়ার পরও বন বিভাগের জরুরি উদ্ধারকারী দল বা ‘রেসকিউ টিম’ সময়মতো পৌঁছায় না। ফলে উত্তেজিত জনতা দ্রুত প্রাণীটিকে পিটিয়ে হত্যা করে।
চৌগাছার বাড়ীয়ালী গ্রামের প্রাণ প্রকৃতি রক্ষা কমিটির সদস্য জুবায়ের হোসেন বলেন, ‘আমাদের গ্রামে একের পর এক নিরীহ মেছো বিড়াল পিটিয়ে হত্যা করা হচ্ছে। বিশেষ করে বন বিভাগের উদাসীনতা এর জন্য প্রধানত দায়ী। দূরবর্তী গ্রামে কোনো প্রাণী বিপদে পড়লে আমরা খবর দিই, কিন্তু উদ্ধারকারী দল সময়মতো আসে না। উদ্ধার সরঞ্জাম ও জরুরি ব্যবস্থার অভাবে আমাদের চোখের সামনেই প্রাণীগুলো প্রাণ হারায়।’
যশোর বন বিভাগের কর্মকর্তা অমিতা মন্ডল জানান, ‘সীমিত জনবল ও নানা সীমাবদ্ধতার মধ্যেও খবর পেলে আমরা দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার চেষ্টা করি। মেছো বিড়াল রক্ষায় আইনি কঠোরতার পাশাপাশি সচেতনতা বাড়াতে কাজ চলছে।’
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের বন্যপ্রাণী গবেষক আমিনুর রহমান বলেন, ‘মেছো বিড়াল কোনো হিংস্র প্রাণী নয়, এটি আমাদের জলজ পরিবেশের বন্ধু। অনর্থক আতঙ্কের কারণে যদি দ্রুত সচেতনতা না বাড়ানো যায়, তবে স্থানীয় কৃষি ও পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হবে।’
একই বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. এম. এ. আজিজ উল্লেখ করেন, ‘বৃহত্তর যশোর অঞ্চলে হঠাৎ মেছো বিড়াল নিধনের হার যেন বাড়ছে, তা বন অধিদপ্তর ও সংশ্লিষ্টদের গুরুত্বের সাথে খতিয়ে দেখা উচিত। বাসস্থান রক্ষা ও স্থানীয়দের সচেতন করতে সুনির্দিষ্ট উদ্যোগ প্রয়োজন।’
জাপানের রিতসুমিখান বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক সহকারী-অধ্যাপক ড. আই সুজুকি সতর্ক করে বলেন, ‘আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে মেছো বিড়াল একটি সংকটাপন্ন প্রজাতি। যশোরের জলজ অববাহিকা এদের টিকে থাকার জন্য বৈশ্বিকভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একে রক্ষা করা না গেলে তা বিশ্ব পরিবেশ বিজ্ঞানের জন্যই বড় ক্ষতি।’
যশোরের প্রকৃতি থেকে প্রাণীটি হারিয়ে যাওয়ার আগেই সরকারি-বেসরকারি সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়া আবশ্যক জনসচেতনতা বৃদ্ধি: মেছো বিড়াল মানুষ বা গবাদিপশুর জন্য ক্ষতিকর নয়—এই তথ্য পৌঁছে দিতে উঠান বৈঠক, লিফলেট বিতরণ ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রচারণা চালাতে হবে।
জরুরি রেসকিউ টিম:
উপজেলা পর্যায়ে প্রশিক্ষিত বন্যপ্রাণী উদ্ধারকারী দল গঠন এবং জরুরি রেসকিউ সেবা নিশ্চিত করতে হবে।
আইনের কঠোর প্রয়োগ মেছো বিড়াল হত্যাকারীদের চিহ্নিত করে বন্যপ্রাণী আইন অনুযায়ী দ্রুত শাস্তির আওতায় আনতে হবে।
আবাসস্থল ও পরিবেশ সুরক্ষা:
নদীর অববাহিকার ঝোপঝাড় ও প্রাকৃতিক জলাশয় ভরাট আইন করে বন্ধ রাখতে হবে।
ক্ষতিপূরণ ব্যবস্থা:
হাঁস-মুরগি বা মাছের সম্ভাব্য ক্ষতির ক্ষেত্রে কৃষক বা খামারিদের সরকারি ক্ষতিপূরণের দ্রুত সহজ ব্যবস্থা থাকলে মানুষ আইন নিজের হাতে তুলে নেবে না।
স্বেচ্ছাসেবীদের সম্পৃক্তকরণ: স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবক দলগুলোকে প্রশিক্ষণ, প্রাথমিক চিকিৎসার সরঞ্জাম ও আর্থিক সহায়তা দিয়ে উদ্ধারকাজে যুক্ত করতে হবে।
‘ডোরা দেখে নেই ভয়, মেছোবিড়াল বাঘ নয়’—এই বার্তাটি মাঠপর্যায়ে ছড়িয়ে দিয়ে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা ও স্থানীয় জীববৈচিত্র্য বাঁচাতে এখনই সমন্বিত পদক্ষেপ গ্রহণ করা সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।