বৃহস্পতিবার ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৮ ভাদ্র ১৪৩৩
প্রকাশিত: ২০২৬-০৯-০২ ২১:১২:৪৪
উবাঈদুল হুসাইন আল্ সামি, যশোর প্রতিনিধি:
সবজি চাষের রাজধানী খ্যাত যশোরে এবার বাণিজ্যিক ভিত্তিতে কচুর লতির বাম্পার ফলন হয়েছে। জেলার আটটি উপজেলার বিস্তৃত মাঠজুড়ে অন্যান্য সবজির পাশাপাশি কচুর লতির আবাদ এখন বিশেষ জায়গা করে নিয়েছে। অনুকূল আবহাওয়া, উর্বর মাটি এবং কৃষি বিভাগের সময়োপযোগী পরামর্শে কম খরচে অধিক লাভের মুখ দেখছেন স্থানীয় চাষিরা।
উৎপাদিত এই লতি স্থানীয় চাহিদা মেটানোর পর পাইকারদের হাত ধরে পৌঁছে যাচ্ছে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তিক জেলায়। ফলে ধান বা অন্যান্য ঐতিহ্যবাহী ফসলের অনিশ্চয়তা কাটিয়ে লতি চাষেই নিজেদের নতুন ভাগ্য ফেরাচ্ছেন যশোরের শত শত কৃষক।
যশোরের উর্বর মাটি ও কৃষি উপযোগিতার কারণে যুগ যুগ ধরেই এ অঞ্চল সবজি উৎপাদনে খ্যাতি অর্জন করেছে। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে লতি কচুর বাণিজ্যিক আবাদ এ অঞ্চলে এক নতুন মাত্রা যোগ করেছে।
জেলার চৌগাছা উপজেলার ফুলসারা, পাশাপোল ও সিংহঝুলি ইউনিয়ন, বাঘারপাড়া উপজেলার বন্দবিলা, জহুরপুর ও রায়পুর ইউনিয়ন, শার্শা উপজেলার ডিহি, কায়বা ও নাভারণ ইউনিয়ন, ঝিকরগাছা উপজেলার বাঁকড়া ও মাগুরা ইউনিয়ন, মনিরামপুর উপজেলার নেহালপুর, হরিহরনগর ও মনোহরপুর ইউনিয়ন, কেশবপুর উপজেলার পাঁজিয়া ও সুফলাকাঁটি, যশোর সদরের চুরামনকাটি, কাশিপুর, ইচালি, দেয়াড়া, লেবুতলা ও সাতমাইল এবং অভয়নগর উপজেলার সিদ্দিরপাশা ও প্রেমবাগ ইউনিয়নের মাঠে মাঠে এখন লতির সবুজ সমারোহ।
একসময় যেসব জমিতে কেবল ধান চাষ হতো, সেগুলোর বড় একটি অংশ এখন স্থান করে নিয়েছে কচুর লতি চাষে। কৃষকদের মতে, সঠিক যত্ন আর নিয়মিত পরিচর্যা পেলে লতি কচু থেকে দীর্ঘ সময় ধরে ফলন পাওয়া যায়, যা অন্য অনেক ফসলের ক্ষেত্রে সম্ভব নয়।
যশোর-মাগুরা মহাসড়কের কোল ঘেঁষে অবস্থিত ‘পুলের হাট বাজার’। অঞ্চলটি এখন দেশের অন্যতম প্রধান কচুর লতির বাজার হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। সপ্তাহের শনি ও মঙ্গলবার অফিসিয়াল হাটের দিন হলেও বাস্তবে সপ্তাহের সাত দিনই এখানে জমে ওঠে লতির বিকিকিনি।
স্থানীয় বাঘারপাড়াসহ পার্শ্ববর্তী বিভিন্ন উপজেলা থেকে কৃষকরা প্রতিদিন ভোর হতেই ক্যানভাস ও ভ্যান বোঝাই করে লতি নিয়ে ছোটেন এই হাটে। পুলের হাটের পাশাপাশি নিকটস্থ বাজারেও চলে সমান তালে বেচাকেনা।
হাটে আসা পাইকারি ব্যবসায়ীরা জানান, প্রতিদিন কেবল এই পুলের হাট থেকেই কয়েক হাজার মণ কচুর লতি হাতবদল হয়। ভোর থেকে শুরু হয়ে সকাল গড়াতেই শত শত মণ লতি কায়িক শ্রমে বস্তাবন্দী ও ট্রাকে লোড করা হয়। চুরামনকাটি, সাতমাইল, আব্দুলপুর, চৌগাছা কাঁচাজার ও বাঁকড়ার হাটগুলো থেকেও নিয়মিত লতি সংগ্রহ করছেন দেশের দূর-দূরান্ত থেকে আসা ব্যাপারীরা। সেখান থেকে লতির বিশাল চালান চলে যায় রাজধানী ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেটসহ দেশের বড় বড় পাইকারি আড়তে।
লতি চাষে কৃষকদের আগ্রহ বৃদ্ধির পেছনে রয়েছে চমৎকার লাভজনকতার হিসাব। ঐতিহ্যবাহী ধান চাষে প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝুঁকি ও ন্যায্যমূল্যের অভাব থেকে বাঁচতে অনেক কৃষকই এখন ঝুঁকছেন লতিতে।
চৌগাছা উপজেলার ফুলসারা গ্রামের চাষি শহিদুল ইসলাম বলেন, "আগে জমিতে নিয়মিত ধান চাষ করতাম। কিন্তু একবার টানা বর্ষায় ধানের ব্যাপক ক্ষতি হয়ে বড় অঙ্কের লোকসান গুনতে হয়। এরপর উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তার পরামর্শে পরীক্ষামূলকভাবে কচুর লতি চাষ শুরু করি। প্রথম বছরেই প্রত্যাশার চেয়ে ভালো লাভ পাই। এরপর থেকে ধান ছেড়ে পুরোদমে লতি চাষেই মন দিয়েছি। বাজারে অন্য যেকোনো সবজির চেয়ে লতির দাম বেশি ও স্থিতিশীল থাকে, তাই ঝুঁকি অনেক কম।"
একই অভিজ্ঞতা ব্যক্ত করেন একই এলাকার কৃষক প্রদীব কুমার রায়। তিনি জানান, ধান চাষের তুলনায় লতি চাষে কিছুটা শারীরিক পরিশ্রম বেশি হলেও আর্থিক দিক থেকে এটি অত্যন্ত লাভজনক।
আয়-ব্যয়ের হিসাব দিয়ে তিনি বলেন, "চলতি মৌসুমে আমার ৪৫ শতক জমিতে কচুর লতি চাষ করতে গিয়ে সার, চারা ও পরিচর্যা বাবদ মোট খরচ হয়েছে প্রায় ৪০ হাজার টাকা। অথচ এই জমি থেকে এ পর্যন্ত আমি প্রায় ১ লাখ টাকার লতি বিক্রি করেছি। সব খরচ বাদ দিয়েও আমার নিট লাভ থাকছে ৬০ হাজার টাকা। কম সময়ে এত অল্প খরচে অন্য কোনো ফসল থেকে এত টাকা আয় করা সম্ভব নয়।
যশোরের মাটি ও আবহাওয়ার কারণে এখানকার কচুর লতি অত্যন্ত মানসম্মত ও সুস্বাদু হয়ে থাকে। বাজারে এই লতির আলাদা একটি পরিচিতি ও চাহিদা তৈরি হয়েছে।
পুলের হাটের পাইকারি ব্যবসায়ী জাকির হোসেন জানান, "দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে আসা আড়তদার ও খুচরা বিক্রেতারা যশোরের লতির জন্য মুখিয়ে থাকেন। এখানকার লতি খেতে অত্যন্ত সুস্বাদু। ফলে ঢাকা বা অন্যান্য অঞ্চলের বাজারে এটি নেওয়ার সাথে সাথেই বিক্রি হয়ে যায়। পণ্যের চাহিদা ও গুণগত মান ভালো বলেই আমরা কৃষকদের ভালো দাম দিতে পারি, আর কৃষকরাও এতে দারুণ উৎসাহিত হচ্ছেন।"
বাঘারপাড়া উপজেলার কৃষি কর্মকর্তা সাইয়েদা নাসরিন জাহান জানান, "আগে এই অঞ্চলের বন্দবিলায় হাতেগোনা চার-পাঁচজন চাষি লতি কচুর চাষ করতেন। কিন্তু মাটি ও আবহাওয়ার সার্বিক উপযোগিতা প্রমাণ হওয়ার পর এখন প্রায় শতভাগ উপযুক্ত জমিতে বাণিজ্যিকভাবে এটি ছড়িয়ে পড়েছে। এখান থেকে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে লতিচুর চারা চলে যাচ্ছে। উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তারা সরাসরি মাঠে গিয়ে কৃষকদের সুষম সার প্রয়োগ, সময়মতো ওষুধ দেওয়া ও আধুনিক পরিচর্যা বিষয়ে নিয়মিত পরামর্শ দিচ্ছেন।"
যশোর জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক (ভারপ্রাপ্ত) আবুল হাসান জানান, "যশোরে সবজি চাষ বরাবরই সমৃদ্ধ। চলতি মৌসুমে আগাম সবজি খরিপ-২ এর আওতায় এই জেলার মোট ৬ হাজার ৬৬৫ হেক্টর জমিতে বিভিন্ন জাতের সবজির চাষ হয়েছে। এর মধ্যে ২০২৫-২০২৬ অর্থ বছরে ১৬৫ হেক্টর জমিতে বাণিজ্যিক কচুর লতিরই চাষ হয়েছে। মাটি উর্বর হওয়া এবং কৃষকরা সঠিক পরিচর্যা করতে পারায় লতির ফলন হয়েছে আশাতীত। কৃষি বিভাগের পক্ষ থেকে সঠিক সময়ে সারের সুষম ব্যবহারসহ কৃষকদের সার্বিক কারিগরি সহায়তা ও পরামর্শ অব্যাহত রাখা হয়েছে।"
যশোরে কচুর লতির এই জোয়ার কেবল কৃষকদের অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বীই করছে না, বরং দেশের মোট সবজি উৎপাদনেও এক নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে। সরকারি ও স্থানীয় পৃষ্ঠপোষকতা বজায় থাকলে ভবিষ্যতে এই অঞ্চলে কচুর লতি চাষ আরও প্রসারিত হবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন সংশ্লিষ্ট সকলে।
বাজার, কৃষি বিভাগ ও কৃষকের সমন্বয়ে যশোরের মাটিতে লতির যে বিপ্লব শুরু হয়েছে, তা আগামীতে জেলার কৃষি অর্থনীতিতে নতুন মাইলফলক যোগ করবে বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।