বৃহস্পতিবার ০৭ মে ২০২৬, ২৪ বৈশাখ ১৪৩৩

Logo
Add Image

কৃষি দর্পণ

যশোরে কৃষকের উৎপাদন ব্যয়ের সাথে কৃষিবিভাগের খরচ নির্ণয়ে গরমিল: ফসল ফলেছে সোনার দামে, বিক্রি হচ্ছে মাটির দরে

প্রকাশিত: ২০২৬-০৫-০৬ ১৯:৩১:৪৪

News Image

উবাঈদুল হুসাইন আল্-সামি, যশোর প্রতিনিধি:
সরকার নির্ধারিত ইউরিয়ার দাম ছিল ২৭ টাকা, কিন্তু কিনতে হয়েছে ৩৫ থেকে ৩৭ টাকায়। অন্যান্য সার-এর দামও বেশি ছিল। ডিজেলের দাম বাড়ায় সেচ খরচ বেড়েছে। কীটনাশকের দামও বেশি ছিল। ধান কাটা ও ঝাড়াই-মাড়াইয়ের ব্যয় বাড়ায় উৎপাদন খরচ বহুগুণ বেড়েছে। তিনি জানান, পুলেরহাট বাজারে ধানের বর্তমান দর এক হাজার ১০০ টাকা। কিন্তু মণ প্রতি উৎপাদন খরচ সাড়ে ১২০০ টাকার বেশি হওয়ায় এই দামে খরচও উঠছে না। ফলে লোকসান গুনতে হবে।

 

বোরোর আবাদ শুরুর পর সরবরাহ সংকটের এক পর্যায়ে ডিজেলের দাম বেড়ে যায়। ফলে সেচ খরচ বৃদ্ধি পায়। এছাড়াও সরকার নির্ধারিত মূল্যের চেয়েও বেশি দামে ইউরিয়াসহ অন্যান্য সার কিনতে হয়েছে চাষিদের। এরপর মৌসুমের শেষভাগে এসে যোগ হয়েছে শ্রমিক সংকটসহ ধান কর্তনে অধিক মজুরি। জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধিতে ধান পরিবহণেও খরচ বেড়েছে অনেক। এভাবে সবমিলিয়ে চাষাবাদে ব্যয় বাড়লেও বাজার দর উৎপাদন খরচের তুলনায় অনেক কম। ফলে লোকসানের মুখে পড়তে যাচ্ছেন বলে ভাষ্য-যশোর অঞ্চলের ধান চাষিদের।

কৃষকেরা বলছেন, ধান বিক্রির বর্তমান দামে বিঘাপ্রতি উৎপাদনে ৪ হাজার টাকার ওপর লোকসান গুনতে হচ্ছে। এক্ষেত্রে মণপ্রতি হিসেবে লোকসান হচ্ছে আড়াইশ টাকা বা ক্ষেত্রবিশেষে তারও বেশি। তবে এ বিষয়ে কৃষিবিভাগের কর্তাব্যক্তিদের ভাষ্য কৃষক পর্যায়ের উলটো। দপ্তরটির দেওয়া বিঘাপ্রতি বোরো আবাদ খরচ এই প্রতিবেদকের কাছে কৃষকদের সরবরাহ করা ব্যয়ের তুলনায় অনেকটাই ভিন্ন। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের যশোর কার্যালয় সূত্র জানায়, এই জেলায় বিঘাপ্রতি বোরো উৎপাদনে ব্যয় হয়েছে ২৫ হাজার ২৫২ টাকা। অথচ কৃষকদের দেওয়া খাতওয়ারি হিসাব বলছে, এই ব্যয় আরও বেশি-বিঘাপ্রতি উৎপাদন ব্যয় ২৮ হাজার টাকারও ওপর।

 

উৎপাদন ব্যয়ের খাতওয়ারি হিসাব চাওয়া হলে সংশ্লিষ্টরা তা সরবরাহ করতে পারেননি। সবমিলিয়ে বিঘাপ্রতি ২৫ হাজার ২৫২ টাকা ব্যয় হয়েছে-এর বেশি তথ্য দিতে পারেননি দায়িত্বপ্রাপ্তরা। দপ্তরের একটি সূত্র জানিয়েছে, কেন্দ্রীয়ভাবে নির্ধারিত ব্যয়ের হিসাবই মিডিয়াকে দিচ্ছে জেলার কৃষিবিভাগ। বোরো আবাদে উৎপাদন ব্যয়ের যে অঙ্ক দেওয়া হয়েছে, তা স্থানীয়ভাবে নির্ণয় করা নয়।জেলার কৃষি বিভাগ বলছে, এবার ধানের ফলন খুবই ভালো হয়েছে, যাকে ‘বাম্পার ফলন’ বলা হচ্ছে। ইতোমধ্যে যে পরিমাণ জমির ধান কাটা হয়েছে, তাতে বিঘাপ্রতি ফলন পাওয়া গেছে ২৫ থেকে ৩০ মণ। ফলে ভালো উৎপাদনশীলতা এবং সরকার নির্ধারিত মূল্যে ধান বিক্রি করতে পারলে কৃষকেরা লাভবান হবেন। এদিকে, কৃষিপণ্যের বাজারজাতকরণে নিয়োজিত প্রতিষ্ঠান যশোরের সিনিয়র কৃষি বিপণন কর্মকর্তার কার্যালয় সূত্র জানায়, ধান বিক্রির ক্ষেত্রে কৃষক যাতে ন্যায্য দাম পান, সে বিষয়ে কাজ করছে দপ্তরটি। দপ্তর প্রধান কিশোর কুমার সাহার ভাষ্য, উৎপাদন খরচ বাড়ায় এবার কৃষকের লাভবান হওয়ার সম্ভাবনা কম। এক্ষেত্রে সরকারিভাবে গুদামে ধান সংগ্রহের নির্ধারিত মূল্য যদি স্থানীয় বাজারেও কার্যকর করা যায়, তাহলে কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হবেন না।

 

কৃষকদের ভাষ্য, ডিজেলের মূল্য বৃদ্ধি সামগ্রিকভাবে চাষাবাদের যান্ত্রিক প্রক্রিয়ার ওপর প্রভাব ফেলেছে। জ্বালানির দাম বাড়ায় সেচ খরচ বেড়েছে। মৌসুমজুড়ে সরকার নির্ধারিত দামে ইউরিয়া, ডিএপি, টিএসপি ও এমওপি সার কিনতে পারেননি তারা। নির্ধারিত দামের চেয়ে কেজিতে ৫ থেকে ৭ টাকা বেশি দিতে হয়েছে। এরপর ধান কাটা, বহন ও ঝাড়াই-মাড়াইয়ের কাজে খরচ বেড়ে প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। সবমিলিয়ে এবার মৌসুমে উৎপাদন খরচ অনেক বেড়েছে। কিন্তু বাজার দর কম থাকায় লোকসান প্রায় অবধারিত। এ ছাড়া এখনো সরকারিভাবে ধান ক্রয় শুরু হয়নি। ফলে খরচ জোগাতে মাঠ থেকেই কম দামে ধান বিক্রি করতে হচ্ছে। বাজারে নিয়ে গেলেও একই অবস্থা-দাম নিম্নমুখী।

 

যশোরের বিভিন্ন অঞ্চলের কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বিঘাপ্রতি এবার ধান উৎপাদনে গড়ে ২৮ হাজার টাকা পর্যন্ত খরচ হয়েছে। এক্ষেত্রে এলাকাভেদে বিঘাপ্রতি ফলন পাওয়া গেছে ২০ থেকে ২২ মণ। ফলে মণপ্রতি উৎপাদন ব্যয় দাঁড়িয়েছে ক্ষেত্রবিশেষে সাড়ে ১২’শ টাকার বেশি। আর কেজিপ্রতি ধান উৎপাদনে খরচ হয়েছে ৩১ টাকারও বেশি।

 

যশোর সদরের চাঁচড়ার ভাতুড়িয়া গ্রামের কৃষক আহমেদ আলি, মণিরামপুর উপজেলার রোহিতা ইউনিয়নের পলাশি গ্রামের মাহাবুর মোড়ল, চৌগাছার পাশাপোল ইউনিয়নের বাড়ীয়ালী গ্রামের জুবায়ের হোসেনসহ আরও কয়েকজন কৃষক জানান, এক বিঘা জমির ধান ঘরে তুলতে জমি চাষ থেকে শুরু করে ঝাড়াই-মাড়াই পর্যন্ত ২৮ হাজার টাকার বেশি খরচ হয়েছে।

 

তাদের ভাষ্য, জমি কর্ষণে খরচ হয়েছে ১৭০০ থেকে ১৮০০ টাকা। বীজ ও চারা তৈরিতে ব্যয় হয়েছে ১৫’শ টাকার বেশি। ধান রোপণে ব্যয় হয়েছে ২ হাজার টাকা। জমিতে ইউরিয়া দুই হাজার ১০০ টাকা, টিএসপি এক হাজার ৪০ টাকা, এওপি ২০০ টাকা এবং অন্যান্য সারে আরও ২০০ টাকার বেশি খরচ হয়েছে। পোকামাকড় দমনে কীটনাশক খরচ লেগেছে তিন হাজার ৬০০ টাকা। সেচ খরচ পড়েছে ১৬০০ থেকে ২৬’শ টাকা পর্যন্ত। আগাছা দমনে শ্রমিক মজুরি লেগেছে ২৫’শ থেকে তিন হাজার টাকা। ধান কর্তনে খরচ হয়েছে প্রায় ৬ হাজার টাকা। ধান বহনে ব্যয় হয়েছে এক হাজার টাকার বেশি। ঝাড়াই-মাড়াইয়ে ব্যয় হয়েছে ২ হাজার টাকারও বেশি। যারা জমি লিজ নিয়ে আবাদ করেছেন, তাদের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত প্রায় ৩ হাজার টাকা ব্যয় যুক্ত হয়েছে।

 

এছাড়া ধান বাজারে নিতে পরিবহন খরচও বেড়েছে। তেলের দাম বৃদ্ধির কারণে নসিমন-করিমনের ভাড়া বাড়ায় বহন খরচ বৃদ্ধি পেয়েছে।চৌগাছা উপজেলার সুখপুকুরিয়া ইউনিয়নের রামকৃষ্ণপুর গ্রামের কৃষক আবু তালেব বলেন, চার বিঘা জমিতে বোরো আবাদ করেছি। এতে বিঘাপ্রতি ব্যয় হয়েছে ২৮ হাজার টাকারও বেশি। সাম্প্রতিক বৃষ্টিতে নিচু জমির দুই বিঘা ধান জলাবদ্ধতায় তলিয়ে যায়। ওই ধান কেটে মাঠে ফেলে রাখা ছিল। আরও দুই-একদিন ভেজা থাকলে অঙ্কুরোদগম হয়ে যেত। বাধ্য হয়ে ৮৫০ টাকা মণ দরে বিক্রি করে দিয়েছি। তিনি বলেন, বাজারেও ধানের দর এক থেকে দেড় হাজার টাকার বেশি নয়। পরিবহন খরচ দিয়ে বাজারে নিয়ে যাওয়ার চেয়ে বাড়ি থেকেই কম দামে বিক্রি করেছি।

 

একই উপজেলার স্বরূপদাহ ইউনিয়নের সাঞ্চডাঙ্গা গ্রামের কৃষক আব্দুর রাজ্জাক জানান, প্রায় পাঁচ বিঘা জমিতে বোরোর আবাদ করেছেন। ফলন পেয়েছেন প্রতিবিঘায় ২২ থেকে ২৩ মণ। প্রতিমণ ধান বিক্রি করেছেন ১ হাজার ৫০ টাকায়। তার ভাষ্য, বিঘাপ্রতি উৎপাদন খরচ প্রায় ২৮ হাজার টাকা হওয়ায় প্রতিমণে ২০০ টাকার বেশি লোকসান হয়েছে।

 

মণিরামপুরের রোহিতা ইউনিয়নের পলাশি গ্রামের কৃষক মাহাবুর মোড়ল বলেন, মৌসুমের শেষে ধান কাটার শ্রমিক সংকটের পাশাপাশি মজুরি অনেক বেড়েছে। বৃষ্টিতে তলিয়ে যাওয়া জমিতে ধান কাটতে জনপ্রতি শ্রমিকের মজুরি ১০০০ টাকা দিতে হচ্ছে। তিনি জানান, এবছর ধান কাটায় সবচেয়ে বেশি ব্যয় হচ্ছে। এক বিঘা জমিতে ধান কাটতে খরচ হচ্ছে ৬ হাজার টাকা, বহন খরচ এক হাজার টাকার বেশি এবং ঝাড়াই-মাড়াইয়ে প্রায় ২ হাজার টাকা।যশোর সদরের সাড়াপোল গ্রামের কৃষক নৃপেণ মণ্ডল বলেন, এবার সব ধরনের সার বেশি দামে কিনতে হয়েছে।

 

সরকার নির্ধারিত ইউরিয়ার দাম ছিল ২৭ টাকা, কিন্তু কিনতে হয়েছে ৩৫ থেকে ৩৭ টাকায়। অন্যান্য সার-এর দামও বেশি ছিল। ডিজেলের দাম বাড়ায় সেচ খরচ বেড়েছে। কীটনাশকের দামও বেশি ছিল। ধান কাটা ও ঝাড়াই-মাড়াইয়ের ব্যয় বাড়ায় উৎপাদন খরচ বহুগুণ বেড়েছে। তিনি জানান, পুলেরহাট বাজারে ধানের বর্তমান দর এক হাজার ১০০ টাকা। কিন্তু মণপ্রতি উৎপাদন খরচ সাড়ে ১২০০ টাকার বেশি হওয়ায় এই দামে খরচও উঠছে না। ফলে লোকসান গুনতে হবে।

 

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের জেলা কার্যালয়ের উপপরিচালক মোশাররফ হোসেন জানান, ধানের বাম্পার ফলন হয়েছে। বিঘাপ্রতি উৎপাদন পাওয়া যাচ্ছে ২৫ থেকে ৩০ মণ। আশা করা যাচ্ছে কৃষক ভালো দাম পাবেন ও লাভবান হবেন। 
 

Logo
Logo





Logo

আরো পড়ুন

Logo

সম্পাদক : আবু তাহের

© ২০১৪-২০২৬ টাঙ্গাইল দর্পণ, অনলাইন নিউজ পেপার ২৪/৭