রবিবার ০৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২২ ভাদ্র ১৪৩৩
প্রকাশিত: ২০২৬-০৯-০৫ ১৯:২৪:৪৩
ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন।
আমাদের অত্যন্ত প্রিয় ও শ্রদ্ধাভাজন আব্দুল কুদ্দুস মাস্টার ভাইয়ের সহধর্মিণী আজ না ফেরার দেশে চলে গেছেন। মহান আল্লাহ তায়ালার দরবারে বিনম্র প্রার্থনা, তিনি যেন আমাদের প্রিয় কুদ্দুস ভাই এবং তাঁর শোকসন্তপ্ত পরিবারকে এই কঠিন শোক সহ্য করার অটল শক্তি দান করেন। পাশাপাশি, মরহুমার জীবনের যেকোনো একটি নেক আমল ও ভালো কাজের উসিলায় আল্লাহ পাক তাঁকে জান্নাতুল ফেরদৌসের সর্বোচ্চ মাকাম নসিব করুন—আমীন।
শ্রদ্ধাভাজন কুদ্দুস ভাইকে নিয়ে আজ কিছু না বললেই নয়। তিনি ছিলেন অবসরপ্রাপ্ত সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বেতার জগতের সাথে তাঁর নিবিড় সম্পর্ক ছিল সুদীর্ঘকালের। বহু পুরস্কার ও সম্মাননায় ভূষিত এই মানুষটিকে বেতার জগতের একজন সত্যিকারের 'আইকন'ও শ্রোতা সংগঠক বললেও কম বলা হয়। দেশ-বিদেশের বেতার জগতের সাথে যুক্ত মানুষ মাত্রই তাঁকে চিনতেন ও শ্রদ্ধা করতেন। বার্ধক্যজনিত কারণে তাঁর পক্ষে চলাফেরা করা কষ্টকর হলেও, বেতারের যেকোনো অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ পাওয়া মাত্রই শারীরিক অসুস্থতা উপেক্ষা করে তিনি উপস্থিত হতেন। বিশেষ করে আমাদের আয়োজিত প্রায় প্রতিটি অনুষ্ঠানেই তাঁর সরব উপস্থিতি থাকত। একবার পারিবারিক ব্যস্ততার কারণে তিনি সশরীরে আসতে না পেরে আমাকে বলেছিলেন, "ভাই, আপনি তো পুরো অনুষ্ঠান লাইভ দেখাবেন, আমি ভার্চুয়ালি যুক্ত থাকবো।"
আমার শ্বশুরবাড়ি উত্তরবঙ্গে হওয়ায় এবং আমার শ্বশুরের চাকরির সুবাদে কুড়িগ্রাম জেলার নাগেশ্বরী উপজেলায় তিনি বহুবছর কাটিয়েছেন। আমার শ্বশুরের বাসার কাছাকাছিই ছিল ওনার বাড়ি, যে কারণে তাঁর সাথে আমার যোগাযোগ ও ঘনিষ্ঠতা অনেক বেশি ছিল। আমি শ্বশুরবাড়িতে গেলেই তাঁকে ফোন করতাম। তিনি তখন তাঁর পরিচিত অন্যান্য শিক্ষক ও বেতারপ্রেমীদের নিয়ে চলে আসতেন। আমার শ্বশুরের বাসায় বসে চলত চুটিয়ে আড্ডা। একসময় তাঁর সাথে আমার সম্পর্কের গভীরতা আরও বাড়তে থাকে। উত্তরবঙ্গে যখনই আমার কোনো ত্রাণ বিতরণ বা সমাজসেবামূলক কর্মসূচি থাকত, আমি তাঁকে ফোন করতাম এবং তিনি আমার সাথে থেকে সেসব এলাকায় ত্রাণ কার্যক্রমে অংশ নিতেন। তিনিও এই আয়োজনগুলো ভীষণ উপভোগ করতেন।
বয়সে আমার অনেক প্রবীণ হওয়া সত্ত্বেও একসময় আমি তাঁকে ‘ভাই’ ডাকা বন্ধ করে ‘শশুরজী’ বলতে শুরু করি এবং পরম মমতায় সেই ডাক এখনো অব্যাহত রয়েছে। অত্যন্ত সদালাপী, অতিথিপরায়ণ ও খোলামনের মানুষ ছিলেন তিনি। আমি তাঁর ক্লাব পরিদর্শন করেছি, ভূরুঙ্গামারীর বাসায় গিয়েছি, কালজয়ী নদী পাড়ি দিয়ে তাঁর গ্রামের বাড়িতেও গিয়েছি। মরহুমের স্ত্রী অর্থাৎ আমার শাশুড়ি মাও অত্যন্ত সহজ-সরল ও সদালাপী একজন মানুষ ছিলেন। আমি আচার খুব পছন্দ করতাম, আর তাঁদের বাড়িতে একটি জলপাই গাছ ছিল। সেই জলপাই দিয়ে তিনি নিজে হাতে আচার তৈরি করতেন। শশুরজী যখনই ঢাকা বা অন্য কোথাও আমার অনুষ্ঠানে আসতেন, ব্যাগে করে সেই আচার নিয়ে আসতেন এবং এমন স্নেহের সাথে আমার হাতে গুঁজে দিতেন যে পাশে থাকা কেউ বুঝতেই পারত না তিনি আমাকে কী দিয়েছেন।
আজ সেই শাশুড়ি মা দুনিয়ার সফর শেষ করে আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন। সবাইকে একদিন এই পথেই যেতে হবে—এটাই চিরন্তন সত্য। তিনি পরম সৌভাগ্যবতী একজন নারী, যিনি স্বামীর হাতের ওপর শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছেন। মহান আল্লাহ তায়ালা তাঁর জীবনের সকল ভুলত্রুটি ক্ষমা করে তাঁকে জান্নাতবাসী করুন। একজন স্বামী হিসেবে তাঁর অন্তরের দোআ আল্লাহ নিশ্চয়ই কবুল করবেন।
জনাব আবদুল কুদ্দুস মাস্টারকে নিয়ে লিখতে গেলে লেখার শেষ হবে না; একটি স্মৃতির কথা শেষ না হতেই আরেকটি স্মৃতি মনে ভেসে ওঠে। এক সময় বাংলাদেশ থেকে বেশ কিছু আন্তর্জাতিক বেতারের সম্প্রচার বন্ধ হয়ে গেলে আমাদের ক্লাবকেন্দ্রিক কার্যক্রম অনেকটাই ঝিমিয়ে পড়েছিল। এর মাঝে বয়স বাড়ার সাথে সাথে ব্যবসা, পরিবার-পরিজন এবং স্থানীয় রাজনীতির ব্যস্ততা আমারও বেড়ে যায়। ব্যস্ততার ভিড়ে চাইলেও সবার সাথে আগের মতো নিয়মিত যোগাযোগ রাখা সম্ভব হতো না। ঠিক সেই সময়ে, বাংলাদেশ থেকে যখন ভয়েস অব আমেরিকার বাংলা সার্ভিসের সম্প্রচার বন্ধ হওয়ার উপক্রম, তখন টাঙ্গাইলের তাহের ভাই, ভারতের নাজিম এবং রেডিও তেহরানের আমাদের সকলের প্রিয় আশরাফ ভাইয়ের উৎসাহে আমরা ‘আইআরআইবি ফ্যান ক্লাব বাংলাদেশ’গঠন করি। আমরা বেশ কিছু বড় বড় অনুষ্ঠানের আয়োজন করি, যার মাধ্যমে সারা দেশের নবীন-প্রবীণ বেতার শ্রোতাদের সাথে আমাদের যোগাযোগ নতুন করে প্রাণ পায়। এরই ধারাবাহিকতায় বিভাগীয় শহরগুলোতে বর্ণাঢ্য আয়োজনের মাধ্যমে আমরা ‘আইআরআইবি ফ্যান ক্লাব, রংপুর বিভাগ’প্রতিষ্ঠা করি। আর সেই ক্লাবের প্রতিষ্ঠাতা কার্যনির্বাহী কমিটির সাধারণ সম্পাদক ছিলেন আমাদের এই বিশিষ্ট বেতার শ্রোতা সংগঠক ও প্রখ্যাত ডিএক্সার আবদুল কুদ্দুস মাস্টার।
আমি আবারও মহান আল্লাহর দরবারে বিনীত প্রার্থনা জানাই, তিনি যেন আমাদের প্রিয় কুদ্দুস ভাইকে এই বিশাল শোক কাটিয়ে ওঠার তৌফিক দেন এবং নেক হায়াতের সাথে তাঁকে পরিপূর্ণ সুস্থতা দান করুন।