রবিবার ০২ আগস্ট ২০২৬, ১৮ শ্রাবণ ১৪৩৩
প্রকাশিত: ২০২৬-০৮-০২ ২১:১৬:২১
এম আব্দুর রাজ্জাক, বিশেষ প্রতিনিধি:
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা ও সার্বিক অগ্রগতি অব্যাহত রাখতে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির টেকসই উন্নয়ন বর্তমান সরকারের প্রথম ও প্রধানতম এজেন্ডা। তিনি বলেন, পুলিশ বাহিনীকে রাজনৈতিক প্রভাব মুক্ত রেখে পিআরবি (PRB) ও প্রচলিত আইন অনুযায়ী পরিচালনা করা হচ্ছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে কোনো প্রকার অন্যায্য রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ করা হচ্ছে না এবং ভবিষ্যতেও করা হবে না।
আজ রবিবার (২ আগস্ট, ২০২৬) বিকালে রাজশাহী পুলিশ লাইনস মাঠে রাজশাহী রেঞ্জ ও রাজশাহী মেট্রোপলিটন পুলিশ (আরএমপি) আয়োজিত রাজশাহীস্থ সকল পুলিশ ইউনিটের অফিসার ও ফোর্সের সাথে মতবিনিময় সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এসব কথা বলেন।
পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মো. আলী হোসেন ফকিরের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় স্বাগত বক্তব্য রাখেন রাজশাহী মেট্রোপলিটন পুলিশের কমিশনার মোহাম্মদ ফয়েজুল কবির এবং শুভেচ্ছা বক্তব্য প্রদান করেন রাজশাহী রেঞ্জের ডিআইজি আশিক সাইদ।
অনুষ্ঠানে অন্যান্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন পুলিশ সদর দপ্তরের অতিরিক্ত আইজিপি (প্রশাসন) এ কে এম আওলাদ হোসেন এবং অতিরিক্ত আইজিপি (অপরাধ ও অপস) খন্দকার রফিকুল ইসলাম, বিপিএম।

মন্ত্রী বলেন, অতীত ফ্যাসিবাদী সরকারের আমলে অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের মতো পুলিশ বাহিনীও সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পুলিশকে রাজনৈতিক স্বার্থে এবং ক্ষমতার স্থায়িত্ব রক্ষায় লাটিয়াল ও পেটুয়া বাহিনী হিসেবে অপব্যবহার করা হয়, যার ফলে র্যাবসহ বিভিন্ন সংস্থাকে যথেচ্ছ ব্যবহারের মাধ্যমে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দেওয়া হয়েছিল। তিনি বলেন, সেই ক্ষয়িষ্ণু অবস্থা থেকে বিগত পাঁচ মাসে পুলিশ বাহিনীর ভাবমূর্তির অনেকটা উন্নয়ন সম্ভব হয়েছে এবং জনগণ বুঝতে পারছে যে সরকার ও পুলিশ বিভাগ যৌথভাবে ইতিবাচক পরিবর্তনের চেষ্টা চালাচ্ছে।
আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় পুরস্কার ও তিরস্কারের নীতি চালু করা হয়েছে উল্লেখ করে মন্ত্রী জানান, জীবনের ঝুঁকি নিয়ে অত্যন্ত সাহসিকতার সঙ্গে দুষ্কৃতকারীদের পাকড়াও করা ও জনসেবায় নিবেদিত পুলিশ সদস্যদের মূল্যায়নে সনদপত্র, প্রমোশন রেটিং, আইজিপি পদক এবং আর্থিক প্রণোদনা প্রদান করা হচ্ছে।
মাঠ পর্যায়ের পুলিশ সদস্যদের বিভিন্ন সমস্যা ও চাহিদার প্রেক্ষিতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত সিদ্ধান্ত ও আধুনিকায়ন পরিকল্পনার ঘোষণা দেন। তিনি বলেন, আধুনিক অপরাধের একটি বড় অংশ সাইবার স্পেস ও ডার্ক ওয়েব কেন্দ্রিক হওয়ায় দেশের প্রতিটি মেট্রোপলিটন এলাকায় উচ্চ ক্ষমতা সম্পন্ন সাইবার ল্যাব এবং বৈচিত্র্যময় অপরাধের হার বিবেচনায় প্রতিটি জেলায় প্রয়োজনীয় সাইবার ল্যাব প্রতিষ্ঠার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
এছাড়া সিআইডির বিভাগীয় ফরেনসিক ও কেমিক্যাল ল্যাবের সক্ষমতা বৃদ্ধি করা হচ্ছে। তিনি নারী পুলিশ সদস্যদের ক্রমবর্ধমান সংখ্যার কথা বিবেচনা করে প্রতিটি বিভাগীয় পুলিশ হাসপাতালে অবিলম্বে বিশেষায়িত গাইনিকোলজি ইউনিট চালুর নির্দেশ দেন। পাশাপাশি রাজশাহী মেট্রো ও রাজশাহী জেলা পুলিশের যৌথ ব্যবহারের জন্য খাস জমি চিহ্নিত করে ডাম্পিং স্টেশন তৈরির আশ্বাস দেন এবং ভূমিমন্ত্রীর সাথে সমন্বয় করে দ্রুত জমি বরাদ্দের প্রতিশ্রুতি জানান।
মন্ত্রী বলেন, রাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে কেস ডকেটের (CD) সুরক্ষায় কেবিনেট মিটিংয়ের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী পুনরায় কেস ডকেট পুলিশের হেফাজতে রাখার ব্যবস্থা বহাল করা হয়েছে। এর পাশাপাশি আদালতে পর্যাপ্ত স্পেস, কেস ডকেট সংরক্ষণাগার, জিআরও রুম এবং আধুনিক হাজতখানা ও মালখানা তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
মন্ত্রী আরো জানান, আবাসন সংকট দূরীকরণে শতাধিক মডেল থানা ভবনের ডিপিপি (DPP) প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। তিনি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের কাজের গুণগত মান নিশ্চিতে পিডব্লিউডি (PWD) কর্তৃক নির্মিত ভবনের তদারকিতে সিনিয়র পুলিশ কর্মকর্তাদের নিয়মিত পরিদর্শনের অনুশাসন প্রদান করেন।
মাঠ পর্যায়ের পুলিশ কর্মকর্তাদের উদ্দেশ্যে মন্ত্রী বলেন, "মব কালচার কোনোভাবেই বরদাশত করা হবে না। তবে কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় অধ্যুষিত এলাকায় স্বাভাবিক মিছিল-মিটিং আর 'মব' এক নয়। বেআইনি জিম্মি বা মব সৃষ্টিকারীদের কঠোর হস্তে দমন করতে হবে।"
বক্তব্যের শেষে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাহসিকতা ও পেশাদারিত্বের সাথে দায়িত্ব পালন করে পুলিশের হারানো ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনার আহ্বান জানান। মতবিনিময় সভায় তিনি উপস্থিত পুলিশ সদস্যদের বিভিন্ন পরামর্শ ও প্রস্তাবনা শুনেন এবং তা বাস্তবায়নে ইতিবাচক ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেন।
পরে এক সংবাদ ব্রিফিংয়ে সংযুক্ত আরব আমিরাতে আটক সাবেক পুলিশ প্রধান বেনজীর আহমদের জামিনের বিষয়ে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী জানান, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ইউএই ত্যাগ করতে পারবেন না—এমন শর্তে সেখানে জামিন পেয়েছেন বলে খবর পাওয়া গেছে। তবে আদালতের চূড়ান্ত শর্তাবলি জানতে জামিনের সার্টিফাইড কপির জন্য আবেদন করা হয়েছে। তিনি জানান, এই বিষয়ে স্বরাষ্ট্র সচিব এবং ইউএই-তে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রাখছেন। তিনি আরও জানান, সরকারের পক্ষ থেকে ইতোমধ্যে সেখানে একটি অভিজ্ঞ 'ল ফার্ম' (আইনি প্রতিষ্ঠান) নিয়োগ করা হয়েছে। 'ল ফার্মকে উক্ত জামিন বাতিলের (Bail Cancellation) জন্য প্রয়োজনীয় আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার স্পষ্ট নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
সরকার আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে জামিন বাতিল করে দ্রুততম সময়ের মধ্যে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে দেশে ফিরিয়ে আনতে আশাবাদী বলে জানান তিনি।