মঙ্গলবার ২১ এপ্রিল ২০২৬, ৮ বৈশাখ ১৪৩৩
প্রকাশিত: ২০২৫-০৭-৩০ ০০:৩২:১০
জুয়েল রানা, সখীপুর (টাঙ্গাইল) প্রতিনিধি:
টাঙ্গাইলের সখীপুর উপজেলার সখীপুর—কচুয়া ও কচুয়া—আড়াইপাড়া সড়ক যেন আর সড়ক নয় একটি দীর্ঘশ্বাসের নাম। একটি অপেক্ষমাণ মৃত্যুফাঁদ। একসময় যে পথ ছিল মানুষের যাতায়াত ও যোগাযোগের অন্যতম মাধ্যম, আজ তা রূপ নিয়েছে চরম দুর্ভোগ ও দুর্ঘটনার উৎসে। দীর্ঘ আট কিলোমিটারজুড়ে বিস্তৃত এই সড়কটি খানাখন্দে ভরা। কোথাও পিচ উঠে গিয়ে বেরিয়ে এসেছে নিচের মাটি, কোথাও বৃষ্টির পানি জমে রূপ নিয়েছে জলাবদ্ধতায়।
দিনভর এই সড়ক ব্যবহার করেন হাজারো পথচারী, শিক্ষার্থী, কৃষিপণ্যবাহী যানবাহন ও ব্যবসায়ীরা। অথচ বছরের পর বছর ধরে কোনো টেকসই সংস্কারের ছেঁায়া পায়নি সড়কটি। সড়কটির দুই পাশে রয়েছে একাধিক গ্রাম, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, হাটবাজার ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান। এই সড়ক দিয়েই চলাচল করতে হয় টাঙ্গাইল সদর, বাসাইল, মির্জাপুর, ঘাটাইল, ভালুকা, ফুলবাড়িয়া ও ত্রিশালসহ একাধিক জেলা ও উপজেলার বাসিন্দাদের।
বর্তমানে আম—কাঁঠালের মৌসুম চলছে। এ সময় সখীপুর থেকে সারা দেশে প্রায় কোটি টাকার কাঁঠাল রপ্তানি হয়ে থাকে এ পথে। কচুয়া, বড়চওনা কাঁঠালের বড় হাট, এছাড়াও দেশের অন্যতম বৃহৎ কলার হাট কুতুবপুরেও যাওয়া হয় এই পথ ধরেই।
বর্ষাকাল আসলেই এই দুর্ভোগ হয়ে ওঠে আরও প্রকট। এবারের বৃষ্টিতে সড়কের পিচ উঠে গিয়ে বহু জায়গায় কাদা—পানিতে একাকার হয়ে গেছে। কোথাও ছোটখাটো যানবাহন চলাচল করতে পারছে না, আবার কোথাও ভারী যানবাহন দেবে যাচ্ছে কাদায়। প্রতিদিনই ঘটছে ছোট—বড় দুর্ঘটনা।

এ সড়কের বেহাল দশায় সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়ছেন শিক্ষার্থী, রোগী, কৃষক ও ব্যবসায়ীরা। কলা, ডিম, মাছ, সবজি ও কাঁচামাল পরিবহন ব্যাহত হওয়ায় একদিকে ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছেন উৎপাদকরা, অন্যদিকে ভোক্তাদের পণ্যের মূল্য গুনতে হচ্ছে বেশি। ফলে গোটা অঞ্চলের অর্থনীতি ও জনজীবনেই নেমে এসেছে স্থবিরতা।
স্থানীয় বাসিন্দা ও ব্যবসায়ী আমিনুল ইসলাম বলেন, এই রাস্তায় বৃষ্টির পানি জমে চলাচল একেবারে অসম্ভব হয়ে পড়ে। অনেক সময় গাড়ি বন্ধ হয়ে যায়। পণ্য পরিবহন তো দূরের কথা, হেঁটে চলাও দুঃসাধ্য হয়ে পড়ে।
ডাকাতিয়া মাজেদা মজিদ উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী জান্নাতুল ফেরদৌস বলেন, প্রতিদিন স্কুলে যেতে জামাকাপড় ভিজে যায়। কাদায় পড়ে যাই। অনেক সময় ভ্যানও চলতে পারে না। আমার মতো অনেকেই এখন স্কুলে যেতে অনীহা প্রকাশ করছে।
অটোরিকশাচালক মো. হারুন জানান, আড়াইপাড়া থেকে কচুয়া পর্যন্ত রাস্তায় গাড়ি চালালে অল্প কদিনেই গাড়ি নষ্ট হয়ে যায়। যা আয় করি, তার বেশিটাই গাড়ির মেরামতে চলে যায়।
সিএনজি চালক আ. রহিম মিয়া বলেন, প্রতিদিন যেখানে ১৫০০ থেকে ২০০০ টাকা আয় হতো, এখন ১০০০ টাকা আয় করাই কষ্ট হয়ে যায়। সময় বেশি লাগে। গাড়ি নষ্ট হয় বেশি। যারা ভাড়ায় গাড়ি চালান তাদের অবস্থা আরও খারাপ।
ঘোনারচালা উচ্চ বিদ্যালয়ের সহকারি শিক্ষক মাইন উদ্দিন বলেন, এই সড়ক দিয়ে প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ চলাচল করছে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে। উন্নয়নের যুগে এসেও আমরা যদি একটা ভালো রাস্তা না পাই, তাহলে সেটা অত্যন্ত দুঃখজনক।
সড়ক ও জনপথ বিভাগ সূত্রে জানা যায়, গোড়াই—সখীপুর—সাগরদিঘী সড়কটি ১৫টন ধারণক্ষমতা হলেও ইট, পাথর, মাটি ও রডবোঝাই ট্রাকসহ ৩০ টনের বেশি ওজনের যানবাহন চলাচল করে। এ কারণে সড়কটি দ্রুত ক্ষতিগ্রস্থ হয়।
সড়কের বর্তমান পরিস্থিতি সম্পর্কে টাঙ্গাইল সড়ক ও জনপথ (সওজ) বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী ড. সিনথিয়া আজমেরী খান বলেন, সম্প্রতি ভারী ও অতি বৃষ্টিপাতের কারণে ভালুকা সখীপুর সড়কের মিলপাড়া নামক স্থানে সড়কে খানাখন্দ সৃষ্টি হলে জরুরী ভিত্তিতে বিভাগীয় মেরামতের মাধ্যমে সড়কটি যানবাহন চলাচল উপযোগী করা হয়। সড়কটির স্থায়ী সংস্কার কাজ সম্পাদনের জন্য অগ্রাধিকার ভিত্তিতে চলতি অর্থবছরে পিরিয়ডিক মেনটেনেন্স প্রোগ্র্রাম সড়ক মেজর এর আওতায় আড়াইপাড়া হতে সখীপুর পর্যন্ত প্রস্তাব প্রেরণ করা হয়েছে। আশা করা যাচ্ছে, প্রস্তাব অনুমোদন প্রাপ্তি সাপেক্ষে দরপত্র প্রক্রিয়া শেষে আগামী দু—তিন মাসের মধ্যে সড়কটির স্থায়ী সংস্কার কাজ সম্পন্ন করা সম্ভব হবে।
এলাকাবাসীর দাবি, দ্রুত এই গুরুত্বপূর্ণ সড়কটির টেকসই সংস্কার না হলে শুধু দুর্ঘটনা বা ব্যবসায়িক ক্ষতিই নয় এ অঞ্চলের শিক্ষার হার কমে যাবে। অর্থনৈতিক গতি থেমে যাবে, আর জনজীবন হয়ে পড়বে আরও দুর্বিষহ।