শুক্রবার ২৬ জুন ২০২৬, ১২ আষাঢ় ১৪৩৩
প্রকাশিত: ২০২৬-০৬-২৬ ১৫:১৫:০০
-মোঃ সাইফুল্লাহ
আরবী ১২ মাসের মধ্যে ১ম মাস মহররম। আর এই মহররম মাসের ১০ তারিখ যাকে আমরা আশুরা বলি। এটি একটি ঐতিহাসিক ঘটনাবহুল তাৎপর্যপূর্ণ দিন। এদিনে অনেক গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ঘটেছে, যার মধ্যে দুটি ঘটনা ইতিহাসের জ্বলন্ত সাক্ষী হয়ে রয়েছে। একটি হলো উদ্ধত জালিমের করুণ পরিণতি, আরেকটি হলো জালিম ও জুলুমের বিরুদ্ধে মাজলুমের আত্মত্যাগ, জীবন দিয়ে সত্যের পতাকাকে সমুন্নত রাখার চেষ্টা করার উজ্জল আদর্শ।
ফেরাউন ছিলো একজন উদ্ধত ও জালিম শাসক। যুগ যুগ ধরে এ ক্ষমতাদর্পি শাসক বনি ইসরাঈলের উপর যাঁরপরনাই অকথ্য নির্যাতন চালিয়েছে। তাদের পুত্র সন্তানদের হত্যা করে কন্যা সন্তানদের জীবিত রেখেছে। এ অহংকারী শাসক দাবি করেছিলো, আমিই তোমাদের মহান প্রভূ"! এ ক্ষমতাধর জালিম স্বৈরশাসককে মহাপরাক্রমশালী আল্লাহ তায়ালা এই দিনেই সলিল সমাধি করে চিরতরে নির্মূল করে জুলুমের নাগপাশ থেকে হযরত মুসা (আঃ) ও বনি ইসরায়েলকে নাযাত দিয়েছিলেন। আল্লাহ তায়ালা ফেরাউনকে নীল দরিয়ায় ডুবিয়ে মেরেই ক্ষান্ত হননি, অধিকন্তু তার মৃতদেহ কে অদ্য সংরক্ষণ করে রেখেছেন, যাতে সে যুগে যুগে হয়ে থাকতে পারে যে, স্বৈরাচারী, দূর্নিবীত, জালিম শাসকদের শেষ পরিণতি কত ভয়াবহ ও করুণ হয়।
এদিনে আরেক স্বৈরশাসক নমরুদের অগ্নিকুণ্ড থেকে আল্লাহ তায়ালা তাঁর খলিল, জাতির পিতা হযরত ইব্রাহিম (আঃ) কে নিরাপদে নিষ্কৃতি দিয়েছিলেন। এ সকল ঘটনা থেকে অন্যায় ও স্বৈরাচারী জালিম শাসকদের জন্য বিশেষ শিক্ষা রয়েছে যে তাদের ক্ষমতা চিরস্থায়ী নয়, বরং সময়ের ব্যবধানে তাদেন পতন অনিবার্য এবং এজন্য তাদেরকে চরম পরিণতি ভোগ করতে হবে। আর আখিরাতে ও তাদের জুলুম ও অন্যায়ের হিসাব কড়ায় গন্ডায় হিসাব দিতে হবে এবং কঠিন ও ভয়াবহ শাস্তি ভোগ করতে হবে। ন্যায় ও সত্যের পতাকাবাহী কাফেলার জন্য এ সকল ঘটনার মূল্যবান শিক্ষা রয়েছে। আর সেটা হলো জুলুম, নির্যাতন,নানাবিধ সংকট প্রভৃতি সাময়িক। এক সময় এ গুলোর অবসান হবে এবং জালিমের ধ্বংসাবশের উপর মহা সত্যের বিজয় কেতন উড়বেই উড়বে ইনশাআল্লাহ ।
কারবালার ময়দানে শাহাদতের মর্মান্তিক ঘটনা হলো আশুরার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। সত্যের পতাকা বাহী মজলুমের রক্তে জালিমদের হাত রঞ্জিত হয়েছে। রাসুলে করিম (সাঃ) এর প্রিয় দৌহিত্র ইমাম হোসাইন (রাঃ) খিলাফতে রাশেদার অগ্রযাত্রাকে অব্যাহত রাখা ও সত্যের পতাকাকে সমুন্নত রাখার জন্য সপরিবারে জীবন কুরবানী করেছেন। জীবন দিয়েছেন কিন্তু অন্যায় ও অসত্যের কাছে মাথা নত করেননি। তাতে যুদ্ধে হোসাইন (রাঃ) এর পরাজয় হয়েছে, কিন্তু জয় হয়েছে সত্যের, জয় হয়েছে আদর্শের, জয় হয়েছে জালিমের বিরুদ্ধে মজলুমের প্রতিবাদী দূর্বার চেতনার। যে চেতনা মজলুমকে অন্যায়ের বিরুদ্ধে এগিয়ে যাওয়ার প্রেরণা যোগায়, আর এতে জালিমের হৃদপিণ্ডে সৃষ্টি করে কাঁপন। যে চেতনা বন্ধুর পথ পাড়ি দিয়ে সামনে এগিয়ে চলার পথ দেখায়, যা একজন সত্য ও ন্যায়ের পথিককে, একজন মুসলিমকে এ দৃপ্ত শপথে উদ্বীপ্ত করে--- জান দেগা, নেহি দেগা আমামা"। কারবালা ও ফুরাত শহীদদের রক্ত শোষে নিঃশেষ করে দেয়নি বরং তা প্রতিটি সত্যপন্হির ধমনিতে প্রবাহিত করেছে প্রাণ সঞ্চার, করেছে মুসলিম ও ইসলামের। তাই তো জনৈক কবি যথার্থই বলেছেন---" ইসলাম জিন্দা হোতা হায় হার কারবালা বাদ"।
কারবালার আসল শিক্ষা হলো, শত ঝড়--ঝন্ঞার মধ্যেও সত্যের পথে অবিচল থাকা, প্রয়োজন হলে ইসলামের জন্য জীবন দিয়ে দেওয়া,তবুও অন্যায়ের কাছে মাথা নত না করা। সত্যের জন্য দ্বীনের জন্য যারা জীবন দেয় আল কোরআনের ভাষায় তারা অমর। তাদের জীবন দান কখনো বৃথা যায় না। বরং তারা চির অম্লান,মানুষের মনে চিরজাগ্রত। আল্লাহর নিকট ও তাদের মর্যাদা সমুন্নত। আমাদেরকে মনে রাখতে হবে---জীবনের চেয়ে দ্বীপ্ত মৃত্যু তখনি জানি, শহীদি রক্তে হেসে উঠে যাবে জিন্দেগানি।
সুতরাং আশুরা মাতম আর বুক চাপড়িয়ে হা হোসেন! হায় হোসেন!করার দিন নয। বরং আশুরা অন্যায়, জুলুম, জঙ্গীবাদ,সন্ত্রাস ও স্বৈরতন্ত্রের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ীয়ে, দৃঢ় প্রত্যায়ে আরো সামনের দিকে এগিয়ে চলার দিন। বিশেষ করে বর্তমানে যখন গোটা বিশ্বের মুসলিমগন এবং দূর্বল ও অসহায় জনগন জালিমের যাতাকলে পিষ্ট, বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় ও সন্ত্রাসীদের ধারালো নখের থাবায় ক্ষত বিক্ষত, মানবতা যখন বিধ্বস্ত তখন আশুরার শিক্ষাকে ধারণ করে মানবতার মুক্তির জন্য সকল প্রকার ত্যাগ স্বীকার করে সর্বাত্নক প্রচেষ্টা চালিয়ে যাওয়াই প্রতিটি বিবেকবান মানুষের, বিশেষ করে প্রতিটি মুসলিমের দায়িত্ব ও কর্তব্য । কাজেই আসুন আমরা আশুরার মূল শিক্ষাকে কাজে লাগিয়ে শ্লোগান তুলি-"-ত্যাগ চাই মর্সিয়া ক্রন্দন চাহিনা। " শহীদের রক্ত বৃথা যেতে দেবো না। আল্লাহ তায়ালা আমাদের সবাইকে হকের পথে টিকে থাকার তৌফিক দান করুন, আমিন...