প্রিন্ট এর তারিখঃ শুক্রবার ০৬ নভেম্বর ২০২৬, ২২ কার্তিক ১৪৩৩


জাতীয়

বেতন নেই, নিরাপত্তা নেই—তাহলে সাংবাদিকরা বাঁচবে কীভাবে?

প্রকাশিত: ২০২৬-১১-০৬ ১৫:৫৩:১২

News Image

-খন্দকার আউয়াল ভাসানী
সাংবাদিকতা একটি মহান পেশা। রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ হিসেবে সাংবাদিকরা সমাজের অসংগতি, দুর্নীতি, অনিয়ম, অন্যায় ও অবিচারের বিরুদ্ধে কলম ধরেন। মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠা, সত্য উন্মোচন এবং সমাজের বিবেককে জাগ্রত রাখার দায়িত্ব পালন করেন তাঁরা। অথচ অত্যন্ত পরিতাপের বিষয়, যাঁরা অন্যের অধিকার নিয়ে কথা বলেন, অনেক ক্ষেত্রেই তাঁদের নিজেদের অধিকারই আজ উপেক্ষিত।

 

একজন সাংবাদিক দিনের পর দিন, রাতের পর রাত মাঠে কাজ করেন। কখনো রোদে পুড়ে, কখনো বৃষ্টিতে ভিজে, কখনো জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সংবাদ সংগ্রহ করেন। রাজনৈতিক সংঘাত, সন্ত্রাস, দুর্নীতি, মাদক, ভূমিদস্যুতা কিংবা ক্ষমতার অপব্যবহারের খবর প্রকাশ করতে গিয়ে অনেক সাংবাদিককে হুমকি, হয়রানি, মামলা, হামলা এমনকি প্রাণনাশের আশঙ্কার মুখেও পড়তে হয়। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই ঝুঁকিপূর্ণ দায়িত্ব পালনের বিনিময়ে তাঁদের প্রাপ্যটুকু কোথায়?

 

দেশের অনেক সংবাদমাধ্যমে কর্মরত সাংবাদিকদের নিয়মিত বেতন-ভাতা নেই, চাকরির নিশ্চয়তা নেই, নেই পর্যাপ্ত চিকিৎসাসুবিধা কিংবা জীবনের নিরাপত্তা। মাসের পর মাস কাজ করেও অনেককে সম্মানী পেতে অপেক্ষা করতে হয়। কেউ কেউ নিজের পকেটের টাকা খরচ করে সংবাদ সংগ্রহ করেন, যাতায়াত ভাড়া দেন, মোবাইল বিল পরিশোধ করেন। অথচ দিনশেষে তাঁদের পরিবারের মুখে খাবার তুলে দেওয়া, সন্তানের লেখাপড়ার খরচ বহন করা কিংবা অসুস্থ মা-বাবার চিকিৎসা করানোই হয়ে ওঠে কঠিন সংগ্রাম।

 

একজন সাংবাদিক কি শুধু কলম আর ক্যামেরা নিয়ে বেঁচে থাকতে পারবেন? তাঁরও তো পরিবার আছে, সন্তান আছে, সংসার আছে, স্বপ্ন আছে। তাঁরও ক্ষুধা লাগে, অসুস্থতা আসে, সন্তানের ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তা হয়। তাহলে সাংবাদিকদের শ্রমের মূল্যায়ন হবে না কেন? তাঁদের জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে না কেন?

 

সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, অনেক ক্ষেত্রে সাংবাদিকদের কাছ থেকে প্রতিষ্ঠানের স্বার্থ রক্ষার প্রত্যাশা করা হয়, কিন্তু তাঁদের ন্যূনতম পেশাগত অধিকার নিশ্চিত করার দায়িত্ব পালনে অনীহা দেখা যায়। সাংবাদিকদের দিয়ে সংবাদ সংগ্রহ, অনুসন্ধান ও প্রচারের কাজ করানো হলেও তাঁদের বেতন, সম্মানী, পরিচয়পত্র, নিয়োগের নিশ্চয়তা এবং নিরাপত্তার বিষয়টি যথাযথ গুরুত্ব পায় না। এভাবে একটি পেশাকে দীর্ঘদিন টিকিয়ে রাখা সম্ভব নয়।

 

আমরা মনে করি, সাংবাদিকদের জন্য ন্যূনতম বেতন কাঠামো, নিয়মিত বেতন পরিশোধ, নিয়োগপত্র, পরিচয়পত্র, কর্মঘণ্টা নির্ধারণ, চিকিৎসাসুবিধা, ঝুঁকি ভাতা এবং আইনি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা জরুরি। একই সঙ্গে সংবাদমাধ্যমের মালিকপক্ষ, সম্পাদক, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ও সাংবাদিক সংগঠনগুলোকে এ বিষয়ে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে।

 

মনে রাখতে হবে, একজন ক্ষুধার্ত সাংবাদিকের কাছে শুধু দায়িত্বের কথা বলে তাঁর জীবনসংগ্রামকে অস্বীকার করা যায় না। পেশাগত স্বাধীনতা যেমন জরুরি, তেমনি জরুরি পেশাগত মর্যাদা ও আর্থিক নিরাপত্তা। যে সাংবাদিক সমাজের মানুষের কণ্ঠস্বর হয়ে ওঠেন, তাঁর নিজের কণ্ঠস্বরও যেন অবহেলা ও বঞ্চনার দেয়ালে আটকে না যায়।

 

সাংবাদিকতা কোনো দয়া বা অনুগ্রহের পেশা নয়; এটি শ্রম, মেধা, সাহস ও দায়িত্বের পেশা। তাই সাংবাদিকদের শ্রমের ন্যায্য মূল্য দিতে হবে। তাঁদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। তাঁদের পরিবারকে বাঁচার নিশ্চয়তা দিতে হবে।

 

শেষ কথা—বেতন নেই, নিরাপত্তা নেই, চাকরির নিশ্চয়তা নেই; তাহলে একজন সাংবাদিক কীভাবে তাঁর দায়িত্ব পালন করবেন, কীভাবে পরিবার নিয়ে বাঁচবেন? সাংবাদিকের কলমের শক্তি তখনই অটুট থাকবে, যখন তাঁর জীবনের ভিত্তিটুকুও নিরাপদ থাকবে। সাংবাদিক বাঁচলে সাংবাদিকতা বাঁচবে, আর সাংবাদিকতা বাঁচলে গণতন্ত্র ও মানুষের অধিকার রক্ষার পথ আরও শক্তিশালী হবে।


এখন সময় এসেছে সাংবাদিকদের শুধু দায়িত্বের কথা না বলে তাঁদের অধিকার, মর্যাদা, জীবিকা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার।