প্রিন্ট এর তারিখঃ শনিবার ১০ অক্টোবর ২০২৬, ২৫ আশ্বিন ১৪৩৩
প্রকাশিত: ২০২৬-১০-১১ ০২:৫৬:৫৮
প্রয়াত আমির খসরু
চার দশকের সাংবাদিকতা জীবনের অবসান, শোকের ছায়া দুই বাংলার শ্রোতা-সাংবাদিক মহলে
নিজস্ব প্রতিবেদক | টাঙ্গাইল দর্পণ
বাংলাদেশে ভয়েস অব আমেরিকা (ভিওএ) বাংলা বিভাগের সাবেক প্রতিনিধি, জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক ও সাপ্তাহিক ‘বুধবার’-এর সাবেক নির্বাহী সম্পাদক আমির খসরু আর নেই। (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)।
আজ শনিবার (১০ অক্টোবর, ২০২৬) সন্ধ্যা ৭টার দিকে রাজধানীর বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের সুপার স্পেশালাইজড হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি শেষনিশ্বাস ত্যাগ করেন। তাঁর মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করেছেন মেয়ে সাদিয়া আফরিন। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স ৬৪ বছর। তাঁর মৃত্যুতে দেশের সাংবাদিক অঙ্গনসহ ভয়েস অব আমেরিকার বাংলা বিভাগের সাবেক ও বর্তমান সহকর্মী, শ্রোতা-বন্ধু এবং শুভানুধ্যায়ীরা শোকাহত।
দীর্ঘদিন ধরে কিডনি ও লিভারের নানা জটিলতায় ভুগছিলেন আমির খসরু। শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে কয়েক দিন আগে তাঁকে বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের সুপার স্পেশালাইজড হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। পরে তাঁকে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) নেওয়া হয়েছিল। চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর মৃত্যুতে সাংবাদিকতার একটি দীর্ঘ ও অভিজ্ঞ অধ্যায়ের অবসান ঘটল।
চার দশকেরও বেশি সময় সাংবাদিকতায়
আমির খসরু ছিলেন অভিজ্ঞতায় ও পেশাদারিত্বে সমৃদ্ধ একজন সাংবাদিক। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নকালে সাপ্তাহিক ‘বিচিত্রা’-য় লেখালেখির মধ্য দিয়ে তাঁর সাংবাদিকতা জীবনের সূচনা। পরবর্তী সময়ে তিনি দেশের বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে কাজ করে নিজের দক্ষতা ও অভিজ্ঞতার পরিচয় দেন।
দৈনিক ‘সংবাদ’ ও দৈনিক ‘ইত্তেফাক’-এ তিনি রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক প্রতিবেদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এ ছাড়া বিভিন্ন গণমাধ্যমে কাজ করার পাশাপাশি সাপ্তাহিক ‘বুধবার’-এর নির্বাহী সম্পাদক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। সংবাদমাধ্যমে তাঁর দীর্ঘ কর্মজীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় ছিল যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক আন্তর্জাতিক সম্প্রচারমাধ্যম ভয়েস অব আমেরিকার (ভিওএ) বাংলাদেশ প্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্ব পালন।
দেশের রাজনীতি, কূটনীতি ও সমসাময়িক ঘটনাবলি নিয়ে সংবাদ সংগ্রহ এবং তা আন্তর্জাতিক শ্রোতাদের কাছে পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। তাঁর সাংবাদিকতা জীবনের ব্যাপ্তি ছিল দেশীয় সংবাদমাধ্যম থেকে আন্তর্জাতিক সম্প্রচার সাংবাদিকতা পর্যন্ত।
রোহিঙ্গা সংকটের মানবিক চিত্র তুলে ধরেছিলেন আন্তর্জাতিক অঙ্গনে
বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর সংকট আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে তুলে ধরার ক্ষেত্রেও আমির খসরুর কাজ বিশেষভাবে স্মরণীয়। ২০১৭-১৮ সালে কক্সবাজারের রোহিঙ্গা শরণার্থীশিবিরে গিয়ে বাস্তুচ্যুত মানুষের জীবনসংগ্রাম, দুঃখ-দুর্দশা ও মানবিক সংকট নিয়ে প্রতিবেদন তৈরির বিষয়টি তাঁর কর্মজীবনের উল্লেখযোগ্য দিক হিসেবে বিবেচিত।
শরণার্থীশিবিরে আশ্রয় নেওয়া মানুষের বাস্তব পরিস্থিতি আন্তর্জাতিক শ্রোতাদের কাছে তুলে ধরতে মাঠপর্যায়ের সাংবাদিকতার গুরুত্ব অপরিসীম। রোহিঙ্গা সংকটের মতো আন্তর্জাতিকভাবে আলোচিত মানবিক বিপর্যয়ের সংবাদ সংগ্রহে তাঁর সম্পৃক্ততা সেই দায়িত্বের কথাই স্মরণ করিয়ে দেয়।
দুই বাংলার অগণিত শ্রোতার স্মৃতিতে আমির খসরু
ভয়েস অব আমেরিকার বাংলা বিভাগ দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশ ও ভারতের বাংলাভাষী শ্রোতাদের কাছে আন্তর্জাতিক সংবাদ, বিশ্লেষণ ও নানা গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার তথ্য পৌঁছে দিয়েছেন। এই সম্প্রচারমাধ্যমের সঙ্গে আমির খসরুর সম্পৃক্ততা তাঁকে বহু শ্রোতার কাছে পরিচিত করে তুলেছিল।
তাঁর মৃত্যুর খবরে বাংলাদেশ ও ভারতের দুই বাংলার অসংখ্য শ্রোতা-বন্ধু, নিয়মিত অনুষ্ঠান-অনুসারী এবং গণমাধ্যমসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মধ্যে শোকের অনুভূতি ছড়িয়ে পড়েছে বলে তাঁর শুভানুধ্যায়ীরা জানিয়েছেন। অনেকের কাছে তিনি কেবল একজন সংবাদদাতা ছিলেন না; বরং আন্তর্জাতিক সংবাদজগতের সঙ্গে বাংলাভাষী মানুষের সংযোগ স্থাপনে ভূমিকা রাখা একজন পরিচিত সাংবাদিক।
বিশেষ করে ভয়েস অব আমেরিকার বাংলা বিভাগের পুরোনো শ্রোতাদের কাছে তাঁর কর্মজীবনের স্মৃতি, সংবাদ পরিবেশনের অভিজ্ঞতা এবং আন্তর্জাতিক ঘটনাবলি সম্পর্কে তাঁর প্রতিবেদন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে থাকবে। দীর্ঘদিনের পরিচিত এই সম্প্রচারমাধ্যমের সঙ্গে যুক্ত একজন সাংবাদিকের চলে যাওয়া তাঁদের জন্যও বেদনাদায়ক।
প্রধানমন্ত্রীর শোক প্রকাশ
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানও তাঁর মৃত্যুতে গভীর শোক ও দুঃখ প্রকাশ করেছেন। শোকবার্তায় আমির খসরুর দীর্ঘ সাংবাদিকতা জীবনের অবদান স্মরণ করা হয়।
সহকর্মী ও সাংবাদিক মহলে শোক
আমির খসরুর মৃত্যুতে দেশের সাংবাদিক অঙ্গনে শোক প্রকাশ করা হয়েছে। বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়ন (বিএফইউজে), ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়ন (ডিইউজে) এবং জাতীয় প্রেস ক্লাবের নেতারাও তাঁর মৃত্যুতে গভীর শোক জানিয়েছেন। শোকবার্তায় তাঁরা মরহুমের রুহের মাগফিরাত কামনা এবং শোকসন্তপ্ত পরিবারের সদস্যদের প্রতি সমবেদনা প্রকাশ করেন।
ভয়েস অব আমেরিকা বাংলা বিভাগের সাবেক প্রধান রোকেয়া হায়দার, বাংলা বিভাগের নিউইয়র্ক সংবাদদাতা, লেখক ও ব্রডকাস্টার আকবর হায়দার কিরণ, ভয়েস অব আমেরিকা ফ্যান ক্লাব বাংলাদেশের সভাপতি জাকারিয়া চৌধুরী যুবরাজ, টাঙ্গাইল দর্পণের সম্পাদক আবু তাহের, চুয়াডাঙ্গার প্রবাহ অনলাইন-এর সম্পাদক মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ, নিউইয়র্ক বাংলার সাংবাদিক এম আব্দুর রাজ্জাকসহ ভয়েস অফ আমেরিকা বাংলার একনিষ্ঠ শ্রোতা ও শুভানুধ্যায়ীরা তার রূহের মাগফেরাত কামনাসহ ও গভীর শোক প্রকাশ করেছেন। সেই সাথে শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি সমবেদনাও জানিয়েছেন।
সাংবাদিকতা অঙ্গনে রেখে গেলেন স্মৃতি ও অবদান
একজন সাংবাদিকের সাফল্য শুধু তাঁর প্রকাশিত সংবাদ বা দায়িত্ব পালন করা প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। তাঁর সংগ্রহ করা তথ্য, মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞতা, সংবাদ পরিবেশনের দক্ষতা এবং মানুষের কাছে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাবলি পৌঁছে দেওয়ার প্রচেষ্টার মধ্যেও তাঁর পেশাগত পরিচয় গড়ে ওঠে।
আমির খসরুর চার দশকের বেশি সময়ের সাংবাদিকতা জীবন সেই দীর্ঘ অভিজ্ঞতারই পরিচায়ক। সাপ্তাহিক ‘বিচিত্রা’য় লেখালেখি দিয়ে শুরু করে দৈনিক সংবাদ, দৈনিক ইত্তেফাক, সাপ্তাহিক ‘বুধবার’ এবং ভয়েস অব আমেরিকার মতো প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত থাকার মধ্য দিয়ে তিনি দেশের সাংবাদিকতা জগতে নিজের অবস্থান তৈরি করেছিলেন।
তাঁর মৃত্যুতে পরিবার-পরিজন, সহকর্মী, শ্রোতা-বন্ধু ও শুভানুধ্যায়ীরা একজন অভিজ্ঞ সাংবাদিককে হারালেন। তাঁর কর্মজীবনের স্মৃতি এবং সংবাদমাধ্যমে অবদান দীর্ঘদিন স্মরণীয় হয়ে থাকবে।
টাঙ্গাইল দর্পণ পরিবারের পক্ষ থেকে প্রয়াত সাংবাদিক আমির খসরুর বিদেহী আত্মার মাগফিরাত কামনা করেছেন। মহান আল্লাহ তাঁকে ক্ষমা করুন, জান্নাতুল ফেরদৌস নসিব করুন এবং শোকসন্তপ্ত পরিবারের সদস্য, সহকর্মী ও অসংখ্য শুভানুধ্যায়ীদের এই শোক সহ্য করার শক্তি দান করুন। আমিন।