প্রিন্ট এর তারিখঃ শনিবার ০৩ অক্টোবর ২০২৬, ১৮ আশ্বিন ১৪৩৩
প্রকাশিত: ২০২৬-১০-০৩ ১৩:১৬:৫১
তৌফিক ইমরোজ খালিদী, বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক
লন্ডন থেকে চিরবিদায় নিলেন বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক
বাংলাদেশের অনলাইন ও ডিজিটাল সাংবাদিকতার বিকাশে অগ্রণী ভূমিকা রাখা সাংবাদিক ও গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব তৌফিক ইমরোজ খালিদী আর নেই (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। মাত্র ৫৯ বছর বয়সে শুক্রবার (২ অক্টোবর ২০২৬) লন্ডনের একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মারা গেছেন। তাঁর অকাল প্রয়াণে টাঙ্গাইল দর্পণ পরিবারের পক্ষ থেকে গভীর শোক ও পরিবারের প্রতি সমবেদনা প্রকাশ করছে।
লন্ডনের স্থানীয় সময় শুক্রবার দুপুর ২টা ২৩ মিনিটে সেন্ট বার্থোলোমিউ’স হাসপাতালে চিকিৎসকরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন। বৃহস্পতিবার রাতে হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়ার পর মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণজনিত কারণে তাকে হাসপাতালে নেওয়া হয়েছিল। তিনি ব্যক্তিগত সফরে লন্ডনে অবস্থান করছিলেন। পরিবারের পক্ষ থেকে মরদেহ দেশে আনা, জানাজা ও দাফনের সময়-স্থান পরে জানানো হবে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে।
তৌফিক ইমরোজ খালিদীর মৃত্যুতে দেশের সাংবাদিকতা ও গণমাধ্যম অঙ্গনে নেমে এসেছে গভীর শোক। রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর শোকবার্তায় তাকে বাংলাদেশের অনলাইন ও ডিজিটাল সাংবাদিকতার বিকাশের একজন পথিকৃৎ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। রাষ্ট্রপতি বলেন, তার মৃত্যুতে দেশ একজন অভিজ্ঞ, সজ্জন ও বরেণ্য গণমাধ্যম ব্যক্তিত্বকে হারিয়েছে; সাংবাদিকতা ও গণমাধ্যমে তার অবদান দীর্ঘদিন স্মরণীয় হয়ে থাকবে।
ডিজিটাল সাংবাদিকতার পথ দেখানো মানুষ
বাংলাদেশে ইন্টারনেটভিত্তিক সংবাদসেবার বিকাশের ইতিহাসে তৌফিক ইমরোজ খালিদীর নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। ২০০৫ সালে ‘বিডিনিউজ’ সংবাদ সংস্থা হিসেবে ইন্টারনেটের মাধ্যমে সংবাদ সরবরাহ শুরু করে। পরের বছর মালিকানা ও ব্যবস্থাপনায় পরিবর্তনের পর তার নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠানটি নতুন রূপ নেয়।
২০০৬ সালের ২৩ অক্টোবর বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম নতুন আঙ্গিকে ২৪ ঘণ্টার সংবাদসেবা হিসেবে যাত্রা শুরু করে। সে সময় দেশে সংবাদ পরিবেশনের প্রচলিত মাধ্যম ছিল মূলত সংবাদপত্র, টেলিভিশন ও প্রচলিত বার্তা সংস্থা। ইন্টারনেটকে কেন্দ্র করে সার্বক্ষণিক সংবাদকক্ষ পরিচালনার উদ্যোগটি বাংলাদেশের গণমাধ্যমে নতুন যুগের সূচনা করে।
তৌফিক ইমরোজ খালিদীর নেতৃত্বে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম দ্রুত একটি গুরুত্বপূর্ণ ডিজিটাল সংবাদমাধ্যমে পরিণত হয়। ‘সবার আগে নির্ভুল খবর’—এই দর্শনকে সামনে রেখে সংবাদ প্রকাশের ক্ষেত্রে দ্রুততার পাশাপাশি তথ্য যাচাই ও বস্তুনিষ্ঠতার ওপর গুরুত্ব দেওয়ার কথা বিভিন্ন স্মৃতিচারণে উঠে এসেছে।
সাংবাদিকতায় ৩৭ বছরের পথচলা
১৯৬৭ সালের ১৪ জুন জন্ম নেওয়া তৌফিক ইমরোজ খালিদীর সাংবাদিকতা জীবনের শুরু ১৯৮৯ সালে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগে পড়াশোনা শেষে তিনি সাংবাদিকতায় প্রবেশ করেন।
কর্মজীবনের শুরুতে তিনি ‘সানডে এক্সপ্রেস’-এ সহকারী সম্পাদক হিসেবে কাজ করেন। পরবর্তী সময়ে দেশের অন্যতম প্রধান ইংরেজি দৈনিক দ্য ডেইলি স্টার এবং দ্য ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেসে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন। ডেইলি স্টারে তিনি কূটনৈতিক প্রতিবেদক, বিজনেস এডিটর, উইকেন্ড এডিশনের বার্তা সম্পাদক ও যুগ্ম বার্তা সম্পাদকের মতো দায়িত্বে ছিলেন।
২০০০ সালের ফেব্রুয়ারিতে তিনি যোগ দেন বিবিসি ওয়ার্ল্ড সার্ভিসে। ২০০৫ সালের জুন পর্যন্ত সেখানে সংবাদ ও কারেন্ট অ্যাফেয়ার্স অনুষ্ঠান প্রযোজনা ও উপস্থাপনা করেন। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন ঘটনা নিয়ে বিশেষ প্রতিবেদন তৈরির পাশাপাশি বিবিসির আলোচিত ‘ডিবেট’ অনুষ্ঠানও সঞ্চালনা করেছেন তিনি।
২০০৫ থেকে ২০০৬ সালের মধ্যবর্তী সময়ে বাংলাদেশ ও যুক্তরাজ্যে ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক ও পরামর্শক হিসেবেও কাজ করেন তিনি।
বিডিনিউজের সঙ্গে দুই দশকের সম্পর্ক
২০০৬ সালে তৌফিক ইমরোজ খালিদীর নেতৃত্বে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম নতুন যাত্রা শুরু করার পর থেকে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি প্রতিষ্ঠানটির নেতৃত্বে ছিলেন। তিনি প্রধান সম্পাদক ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন এবং প্রতিষ্ঠানের মালিকানা কাঠামোর সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন।
মৃত্যুর মাত্র কয়েক সপ্তাহ পরই বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের ২০তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উদযাপনের প্রস্তুতি চলছিল। প্রতিষ্ঠানের সহকর্মীরা জানিয়েছেন, খালিদী নিজেই প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর বিভিন্ন পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করছিলেন। আকস্মিক মৃত্যুতে সেই আয়োজনের আগেই থেমে গেল তার দীর্ঘ কর্মযাত্রা।
তার নেতৃত্বে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম শুধু একটি অনলাইন সংবাদমাধ্যম হিসেবে নয়, বাংলাদেশের ডিজিটাল সংবাদসেবার বিকাশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচিতি পায়।
সাংবাদিকতার স্বাধীনতা ও বস্তুনিষ্ঠতার পক্ষে অবস্থান
সহকর্মী ও দীর্ঘদিনের পরিচিতদের স্মৃতিচারণে তৌফিক ইমরোজ খালিদীর সাংবাদিকতায় পেশাদারিত্ব, তথ্য যাচাই এবং বস্তুনিষ্ঠতার বিষয়টি বিশেষভাবে উঠে এসেছে।
সাবেক সহকর্মী ও সাংবাদিক আফসান চৌধুরী তাকে বাংলাদেশের অনলাইন সাংবাদিকতার বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা একজন সাংবাদিক হিসেবে স্মরণ করেছেন। অন্যদিকে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ মুশতাক হোসেন বলেন, তৌফিক খালিদী অনলাইন সাংবাদিকতাকে একটি মানসম্মত ও প্রতিশ্রুতিশীল জায়গায় নিয়ে গিয়েছিলেন এবং সংবাদ প্রকাশে যাচাই করা তথ্যের ওপর গুরুত্ব দিতেন।
সুপ্রিম কোর্ট রিপোর্টার্স ফোরামও তাকে দেশের অনলাইন ও ডিজিটাল সাংবাদিকতার ‘পথিকৃৎ’ হিসেবে উল্লেখ করেছে। চট্টগ্রাম সাংবাদিক ইউনিয়নের শোকবার্তায় তাকে ‘আপসহীন সাংবাদিকতার পথিকৃৎ’ হিসেবে স্মরণ করা হয় এবং তার মৃত্যু দেশের সাংবাদিকতা ও গণমাধ্যম অঙ্গনের জন্য অপূরণীয় ক্ষতি বলে উল্লেখ করা হয়।
জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পরিসরে পরিচিতি
সাংবাদিকতার পাশাপাশি জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়েও তৌফিক ইমরোজ খালিদীর সক্রিয় অংশগ্রহণ ছিল।
২০১৬ সালে ইউনেস্কো আয়োজিত বিশ্ব মুক্ত গণমাধ্যম দিবসের অনুষ্ঠানে তিনি সভাপতিত্ব করেন। ২০০৯ সালে কোপেনহেগেনে জাতিসংঘ জলবায়ু সম্মেলনে পর্যবেক্ষক হিসেবে অংশ নেন। ২০১০, ২০১৬, ২০১৭ ও ২০১৯ সালে জার্মানির বন শহরে অনুষ্ঠিত গ্লোবাল মিডিয়া ফোরামেও অংশ নেন। ২০১৮ সালে যুক্তরাষ্ট্রের হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে আয়োজিত ‘বাংলাদেশ রাইজিং’ সম্মেলনে প্যানেল আলোচক ছিলেন।
২০১৪ সালে দক্ষিণ আফ্রিকায় অনুষ্ঠিত সাউথ-টু-সাউথ মিডিয়া ডায়ালগে তাকে এশিয়া-প্যাসিফিক, লাতিন আমেরিকা ও পশ্চিম এশিয়ার নির্বাচিত ডিজিটাল মিডিয়া উদ্ভাবকদের একজন হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। ২০১৭ সালে জাতীয় তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি দিবস উপলক্ষে বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকেও তিনি বিশেষ সম্মাননা পান।
নীতিনির্ধারণেও ছিল সম্পৃক্ততা
শুধু সংবাদকক্ষের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিলেন না তৌফিক ইমরোজ খালিদী। অনলাইন গণমাধ্যম নীতিমালা প্রণয়ন ও পর্যালোচনার জন্য গঠিত জাতীয় কমিটির ২০১২ ও ২০১৫ সালের কার্যক্রমে তিনি সদস্য হিসেবে যুক্ত ছিলেন। ২০০৮ সালে বার্তা সংস্থাগুলোর নীতিমালা প্রণয়ন কমিটি এবং ২০০৭ সালে ঢাকার নদী রক্ষার জন্য গঠিত জাতীয় টাস্কফোর্সেও কাজ করেছেন।
শোকের ছায়া সাংবাদিকতা অঙ্গনে
তার মৃত্যুর সংবাদ ছড়িয়ে পড়ার পর সাংবাদিক, সহকর্মী, বন্ধু, বিভিন্ন পেশাজীবী এবং সংগঠনের পক্ষ থেকে শোক জানানো হয়।
রাষ্ট্রপতি তার মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করে বলেন, তৌফিক ইমরোজ খালিদী ছিলেন অনলাইন ও ডিজিটাল সাংবাদিকতার বিকাশের একজন পথিকৃৎ। তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকেও তাকে দীর্ঘ সাংবাদিকতা জীবনে পেশাদারিত্ব, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা এবং তথ্যভিত্তিক সাংবাদিকতার চর্চায় অবদানের জন্য স্মরণ করা হয়েছে।
তার সাবেক সহকর্মী ও বন্ধুদের স্মৃতিচারণে উঠে এসেছে একজন সাংবাদিক, সম্পাদক, সংগঠক ও সহকর্মী হিসেবে তার দীর্ঘ পথচলার নানা অধ্যায়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের সহপাঠী ও পরবর্তী সময়ে তথ্য সচিব মাহবুবা ফারজানা তাকে প্রতিভাবান সাংবাদিক এবং ঘনিষ্ঠ বন্ধু হিসেবে স্মরণ করেছেন।
রেখে গেলেন একটি প্রতিষ্ঠান, রেখে গেলেন একটি ধারার উত্তরাধিকার
বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যমের ইতিহাসে তৌফিক ইমরোজ খালিদীর সবচেয়ে বড় পরিচয় সম্ভবত একটি পরিবর্তনের সঙ্গে জড়িয়ে আছে—প্রচলিত সংবাদসেবা থেকে ইন্টারনেটভিত্তিক ২৪ ঘণ্টার সংবাদসেবায় বাংলাদেশের উত্তরণ।
দুই দশক আগে যখন ইন্টারনেটভিত্তিক সংবাদমাধ্যমের ধারণা ছিল অনেকটাই নতুন, তখন তার নেতৃত্বে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম যাত্রা শুরু করে। সময়ের সঙ্গে বাংলাদেশের সংবাদ গ্রহণের অভ্যাস বদলেছে, বদলেছে প্রযুক্তি, সংবাদ পরিবেশনের ধরন এবং পাঠকের প্রত্যাশা। সেই পরিবর্তনের দীর্ঘ যাত্রায় তৌফিক ইমরোজ খালিদীর নাম ও কর্মজীবন একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হয়ে থাকবে।
শুক্রবার লন্ডনের হাসপাতালে তার জীবনাবসানের মধ্য দিয়ে শেষ হলো প্রায় ৩৭ বছরের সাংবাদিকতা জীবনের পথচলা। তবে তার হাতে গড়ে ওঠা প্রতিষ্ঠান এবং বাংলাদেশের ডিজিটাল সাংবাদিকতার যে অধ্যায়ের সঙ্গে তার নাম অবিচ্ছেদ্যভাবে যুক্ত, সেটিই হয়তো তার দীর্ঘ কর্মজীবনের সবচেয়ে বড় উত্তরাধিকার।
তৌফিক ইমরোজ খালিদীর মৃত্যুতে সাংবাদিকতা অঙ্গনে যে শূন্যতা তৈরি হয়েছে, তা সহজে পূরণ হওয়ার নয়।