প্রিন্ট এর তারিখঃ শনিবার ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৪ আশ্বিন ১৪৩৩
প্রকাশিত: ২০২৬-০৯-১৯ ১৪:৫৬:৫৮
জুয়েল রানা, সখীপুর (টাঙ্গাইল) প্রতিনিধি:
সংসারের অভাব ঘোচাতে ধারদেনা করে পাড়ি জমিয়েছিলেন গ্রিসে। কিন্তু কাগজপত্রের জটিলতায় সেখানে ১১ মাস অবস্থানের পর দেশে ফিরতে হয় তাঁকে। দেশে ফিরে জীবিকার তাগিদে অটোভ্যান চালানো শুরু করেন। তবে পেশা হিসেবে অটোভ্যান চালালেও তাঁর এই জীবিকার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে এক ব্যতিক্রমী মানবিক উদ্যোগ।
গত প্রায় ১১ বছর ধরে মাদ্রাসাশিক্ষার্থী, আলেম, হাফেজ, মুফতি, ইমাম ও মুয়াজ্জিন তাঁর অটোভ্যানে উঠলে তাঁদের কাছ থেকে কোনো ভাড়া নেন না সখীপুরের ভ্যানচালক ইয়ার মাহমুদ।
ইয়ার মাহমুদ টাঙ্গাইলের সখীপুর উপজেলার কালিয়াপাড়া-ঘোনারচালা এলাকার মো. হাসান আলীর ছেলে। ২০১৫ সালে গ্রিস থেকে দেশে ফেরার পর অটোভ্যান কিনে সখীপুর-সাগরদিঘী ও কচুয়া-ভালুকা সড়কে যাত্রী পরিবহন করে জীবিকা নির্বাহ করছেন তিনি।
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, প্রতিদিন গড়ে অন্তত ১০ জন মাদ্রাসাশিক্ষার্থী, আলেম, হাফেজ, মুফতি, ইমাম ও মুয়াজ্জিন তাঁর অটোভ্যানে যাতায়াত করেন। তাঁদের কাছ থেকে ভাড়া না নিয়ে বিনা মূল্যে গন্তব্যে পৌঁছে দেন তিনি। বিনিময়ে যাত্রীদের কাছে শুধু দোয়া চান ইয়ার মাহমুদ।
অটোভ্যান চালিয়ে সংসার চালানোর পাশাপাশি বিদেশ যাওয়ার সময় করা ঋণও পরিশোধ করছেন তিনি। বর্তমানে তাঁর প্রায় চার থেকে পাঁচ লাখ টাকা ঋণ রয়েছে বলে জানান। এর মধ্যেও দীর্ঘদিন ধরে ভাড়া না নেওয়ার এই উদ্যোগ অব্যাহত রেখেছেন। অবসর সময়ে শখের বশে ‘Ear Mahmud’ নামে ফেসবুক আইডিতে ভিডিও ও বিভিন্ন কনটেন্টও তৈরি করেন তিনি।
ইয়ার মাহমুদের ছেলে ইমন স্থানীয় একটি দাখিল মাদ্রাসায় পড়াশোনা করছে। নিজের সন্তানকে মাদ্রাসায় পড়ানোর পাশাপাশি মাদ্রাসাশিক্ষার্থী ও ধর্মীয় ব্যক্তিদের প্রতি তাঁর বিশেষ সম্মান রয়েছে।
স্থানীয় ইমাম মো. আইন উদ্দিন বলেন, “ইয়ার মাহমুদ ভাই খুব সুন্দর মনের মানুষ। এমন মহৎ কাজের মাধ্যমে তিনি মাদ্রাসাশিক্ষার্থীদের সম্মানিত করছেন। তাঁর জন্য অন্তরের অন্তঃস্থল থেকে মঙ্গল কামনা করি।”
অটোভ্যানের যাত্রী মো. হাবিবুর রহমান বলেন, আজকাল এমন মানুষ খুব কমই দেখা যায়। অনেক সময় ১০ টাকার ভাড়াও কেউ কেউ ২০ টাকা নেন। অথচ ইয়ার মাহমুদ ভাই মাদ্রাসাশিক্ষার্থী, আলেম, হাফেজ, মুফতি, ইমাম ও মুয়াজ্জিনদের কাছ থেকে কোনো ভাড়াই নেন না। বিষয়টি নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়।
নিজের এই ব্যতিক্রমী উদ্যোগের কারণ জানিয়ে ইয়ার মাহমুদ বলেন, আমাদের সংসারে প্রথম সন্তান জন্ম নেওয়ার পর মারা যায়। সন্তানটি মারা যাওয়ার পর আমি নিয়ত করেছিলাম, আল্লাহ যদি আমাকে আবার সন্তান দেন, তাহলে তাকে মাদ্রাসায় পড়াব এবং একজন ভালো আলেম হিসেবে গড়ে তুলব। একই সঙ্গে মাদ্রাসাশিক্ষার্থীদের কাছ থেকে কোনো ভাড়া নেব না।”
তিনি আরও বলেন, “সেই নিয়ত থেকেই মাদ্রাসার শিক্ষার্থী, আলেম, হাফেজ, মুফতি, ইমাম ও মুয়াজ্জিন আমার গাড়িতে উঠলে তাঁদের কাছ থেকে কোনো ভাড়া নিই না। আমার মনে হয়, যেদিন তাঁদের কাছ থেকে ভাড়া নিই না, সেদিন আমার রোজগারও যেন বেড়ে যায়। মহান আল্লাহ যতদিন আমাকে বাঁচিয়ে রাখবেন, ততদিন তাঁদের সম্মান করে যাব।”
ইয়ার মাহমুদ বলেন, “আমি অটোভ্যান চালিয়ে নিজের ঋণ পরিশোধ করতে চাই। মরার আগ পর্যন্ত এই পেশায় থাকতে চাই। ইসলাম ধর্মীয় ব্যক্তিদের সম্মান করাই আমার জীবনের একটি নিয়ত। আমার জীবনে আর কিছু চাওয়ার নেই।”
স্থানীয়দের ভাষ্য, আর্থিক সংকট ও ঋণের চাপের মধ্যেও ইয়ার মাহমুদের এই দীর্ঘদিনের উদ্যোগ তাঁকে এলাকায় একজন মানবিক ও ব্যতিক্রমী মানুষ হিসেবে পরিচিত করেছে।