প্রিন্ট এর তারিখঃ বৃহস্পতিবার ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২ আশ্বিন ১৪৩৩


জেলা খবর

‎আপন মেয়ে ও জামাইয়ের বিরুদ্ধে জমি প্রতারণার অভিযোগ, আদালতে মামলা

প্রকাশিত: ২০২৬-০৯-১৭ ০৫:১০:৩৯

News Image

‎হাবিবুর বাশার, কমলনগর (লক্ষ্মীপুর) প্রতিনিধি:
‎‎“স্বামী মারা যাওয়ার পর এই জমিটুকুই ছিল আমার শেষ সম্বল। নিজের পেটের মেয়েই যদি আমার সঙ্গে এমন করে, তাহলে আমি কার কাছে বিচার চাইব? এখন আমি বৃদ্ধ, অসুস্থ—আমাকে দেখবে কে?

‎কথাগুলো বলতে বলতে কান্নায় ভেঙে পড়ছিলেন লক্ষ্মীপুরের কমলনগর উপজেলার হাজিরহাট ইউনিয়নের ৪ নম্বর ওয়ার্ডের বৃদ্ধ নুর জাহান বেগম। স্বামী মারা যাওয়ার পর যে জমিটুকুকে অবলম্বন করে বাকি জীবনটা কাটানোর স্বপ্ন দেখেছিলেন, সেই জমিটি আপন মেয়ে ও মেয়ের জামাই প্রতারণার মাধ্যমে লিখে নিয়েছেন—এমন অভিযোগ তাঁর পরিবারের।

‎এ ঘটনায় নুর জাহান বেগম লক্ষ্মীপুরের আদালতে একটি সিআর মামলা করেছেন। মামলাটির নম্বর ৭৬০/২৬।

‎নুর জাহান বেগম উপজেলার হাজিরহাট ইউনিয়নের ৪ নম্বর ওয়ার্ডের মিল্লাত একাডেমির পাশের মজু মৌলিসাবেগো বাড়ির মৃত মমিন উদ্দিনের স্ত্রী।

‎পরিবারের সদস্যদের দেওয়া তথ্য ও মামলার অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, নুর জাহান বেগমের স্বামী মৃত মমিন উদ্দিনের নামে ২৫-১০৯৫৬ খতিয়ানের আগত খতিয়ান ৩৭৮৭-এর জাঙ্গালিয়া মৌজার ৪৫০৩৯ দাগে জমি ছিল। স্বামীর মৃত্যুর পর ওয়ারিশসূত্রে ওই সম্পত্তির অংশের মালিক হন নুর জাহান বেগম। পরে তিনি নিজের নামে নামজারিও করেন বলে পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।

‎অভিযোগ, নুর জাহান বেগমের বৃদ্ধ বয়স, সরলতা ও জমি-জমা সম্পর্কে অজ্ঞতার সুযোগ নিয়ে তাঁর ছোট মেয়ে নিলুফা আক্তার কাকন ও তাঁর স্বামী দলিল লেখক মো. হোসেন তাঁকে তাঁদের বাড়িতে নিয়ে যান।

‎পরিবারের দাবি, কিস্তির টাকা নেওয়ার কথা বলে তাঁকে সেখানে নেওয়া হলেও পরবর্তীতে তাঁর কাছ থেকে প্রায় সাড়ে ১৩ শতাংশ জমি রেজিস্ট্রি করে নেওয়া হয়। ওই জমি নিলুফা আক্তার কাকন, তাঁর স্বামী মো. হোসেনসহ তাঁদের তিন মেয়ে—স্মৃতি, মনিয়া ও মুনজারিনের নামে নেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ করা হয়েছে।

‎নুর জাহান বেগমের মেয়ে ফরিদা আক্তার চিনুর দাবি, তাঁর মায়ের কাছ থেকে নেওয়া প্রায় সাড়ে ১৩ শতাংশ জমির বর্তমান বাজারমূল্য প্রায় ৭০ লাখ টাকা। অথচ দলিলে ওই জমির মূল্য মাত্র ৭ লাখ টাকা দেখানো হয়েছে এতে স্পষ্টভাবে বুঝা যাই কিভাবে প্রতারণা করে আমার মায়ের কাছ থেকে জমিন নিয়েছে।

‎ফরিদা আক্তার চিনু বলেন, “আমার মা বৃদ্ধ মানুষ। তিনি জমি-জমার হিসাব বোঝেন না। তাঁর কাছ থেকে বোন ও বোনের জামাইসহ তাঁদের মেয়েদের নামে জমি নেওয়া হয়েছে। দলিলে যে মূল্য দেখানো হয়েছে, তার সঙ্গে বর্তমান বাজারমূল্যের বড় ধরনের পার্থক্য রয়েছে। এ কারণেই আমাদের সন্দেহ আরও বেড়েছে।

‎নুর জাহান বেগমের আরেক মেয়ে নাছরিন বেগম নয়ন বলেন, “আমার মা অনেক বৃদ্ধ। আমরা যখন ওয়ারিশসূত্রে পাওয়া জমি মাপার জন্য যাই, তখন তাঁরা একটি দলিল দেখিয়ে বলেন, এই জমি তাঁরা আমার মায়ের কাছ থেকে কিনে নিয়েছেন। বিষয়টি জানার পর আমার মা খুব ভেঙে পড়েন এবং অসুস্থ হয়ে যান। পরে তিনি আদালতের আশ্রয় নিয়েছেন।”

‎পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য, মায়ের কাছ থেকে জমি লিখে নেওয়ার বিষয়টি জানার পর তাঁরা হতবাক হয়ে যান। তাঁদের অভিযোগ, জমি বিক্রির বিষয়টি আগে তাঁদের জানানো হয়নি।

‎নুর জাহান বেগম বলেন, “আমার স্বামী মারা যাওয়ার পর আমি অনেক কষ্ট করে জীবন কাটিয়েছি। এই জমিটুকুই ছিল আমার ভরসা। বয়স হয়েছে, বারবার অসুস্থ হয়ে পড়ি। চিকিৎসার জন্য টাকা লাগে, সংসার চালাতেও টাকা লাগে। আমি কখনো ভাবিনি আমার নিজের মেয়েই আমার শেষ সম্বলটুকু নিয়ে যাবে।”

‎কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি আরও বলেন, “আমি যদি নিজের মেয়ের ওপর বিশ্বাস না করি, তাহলে কার ওপর করব? এখন আমার কাছে কী আছে? আমার স্বামী নেই, বয়স হয়েছে, অসুস্থ হয়ে পড়ি। এই জমিটুকু থাকলে অন্তত মনে হতো, শেষ বয়সে বেঁচে থাকার একটা অবলম্বন আছে।

‎নুর জাহান বেগমের ছোট ছেলে শিমুল বলেন, “আমার বোনের স্বামী দলিল লেখক হওয়ায় জমি-জমা সম্পর্কে তাঁর ভালো ধারণা রয়েছে। আমার মাকে তাঁদের বাড়িতে নিয়ে কিস্তির টাকা নেওয়ার কথা বলা হয়েছিল বলে আমরা জানতে পেরেছি। পরে জানতে পারি, মায়ের কাছ থেকে জমি লিখে নেওয়া হয়েছে।

‎অভিযোগের বিষয়ে নিলুফা আক্তার কাকনের জামাই, দলিল লেখক মো. হোসেন অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, “আমার মেয়েরা আমার শাশুড়ির কাছ থেকে ৭ লাখ টাকা দিয়ে এই জমি কিনেছে। আমি এ বিষয়ে আর কিছু জানি না।