প্রিন্ট এর তারিখঃ সোমবার ১০ আগস্ট ২০২৬, ২৬ শ্রাবণ ১৪৩৩
প্রকাশিত: ২০২৬-০৮-০৯ ১৯:৫৬:৪৬
উবাঈদুল হুসাইন আল্ সামি, যশোর প্রতিনিধি:
সরকারি নীতিমালা অনুযায়ী সার বিক্রির একমাত্র পথ বিসিআইসি ও বিএডিসির অনুমোদিত ডিলার ও সাব-ডিলার। কিন্তু বাস্তবে যশোরের হাট-বাজার, দোকানে প্রকাশ্যে বিক্রি হচ্ছে অনুমোদনহীন সার। সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে ২৫০ থেকে ৩০০ টাকা বস্তা প্রতি বেশি দামে কিনতে বাধ্য হচ্ছেন কৃষক।
সরকারি হিসাবে গুদামে সারের মজুদ দ্বিগুণ। অথচ মাঠের সাব-ডিলাররা বলছেন, চাহিদার ২০ থেকে ৬০ শতাংশও সার পাচ্ছেন না। তাহলে খোলা বাজারে এত সার যাচ্ছে কীভাবে?
বাংলাদেশ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (DAE) সার বিতরণ নীতিমালা অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের খোলা বাজারে বা লাইসেন্স ছাড়া সার বিক্রি করার সুযোগ নেই। বাংলাদেশে সার বিতরণ ও বিক্রয় কার্যক্রম সম্পূর্ণভাবে সরকার নিয়ন্ত্রিত। এটি কেবল অনুমোদিত বিসিআইসি ডিলার, বিএডিসির ডিলার এবং তাঁদের অধীনে থাকা খুচরা বিক্রেতা বা সাব-ডিলারদের মাধ্যমেই পরিচালিত হওয়ার কথা।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, যশোরের আটটি উপজেলার ১০১টি ইউনিয়ন ও পৌরসভায় বিএডিসির অনুমোদিত ডিলার ও সাব-ডিলার রয়েছেন ১৬২ জন এবং বিসিআইসির অনুমোদিত ডিলার ১৪১ জন।
কিন্তু যশোর পরিসংখ্যান ব্যুরো অফিসের তথ্য বলছে, জেলায় ছোট-বড় মোট সার ও কীটনাশকের দোকানের সংখ্যা ১১৭১টি। এর মধ্যে বিসিআইসির ১৪১ ও বিএডিসির ১৬২ বাদ দিলে অনুমোদনহীন সার-কীটনাশকের দোকানের সংখ্যা দাঁড়ায় ৮৬৮টি।
সদর উপজেলার দেওয়াড়া ইউনিয়নের চাঁন্দুটিয়া গ্রামের কৃষক ওসমান আলী বলেন, “সরকার নির্ধারিত দামে ইউরিয়া ২৫ টাকা, ডিএপি ১৯ টাকা, টিএসপি ২৫ টাকা ও এমওপি ১৮ টাকা কেজি হওয়ার কথা। কিন্তু বাস্তবে এমওপি ২৫ থেকে ৩০ টাকা, টিএসপি ৩০ থেকে ৪০ টাকা, ডিএপি ২৫ থেকে ৩০ টাকা এবং ইউরিয়া অনেক জায়গায় ৩০ টাকা কেজি পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে।”
সদর উপজেলার চাঁন্দুটিয়া বাজারের বিসিআইসির খুচরা সার বিক্রেতা জামাল হোসেন বলেন, “আমরা ডিলার থেকে সার চাহিদা অনুযায়ী আনতে গেলে সার কম পাই। কারণ আমরা সরাসরি কৃষকের কাছে বিক্রি করি। কিন্তু ডিলাররা ৫০% সার কৃষকের কাছে, ৫০% সাব ডিলারদের মাঝে বিক্রি করে। অধিক মুনাফার আশায় কিছু কিছু ডিলার রাতের আঁধারে তাদের পছন্দমত অনুমোদনহীন দোকানদারদের কাছে খোলা বাজারে বিক্রি করে দেয়।”
একই উপজেলার এড়েন্দা বাজারের বিএডিসির সাব ডিলার ইসমাইল হোসেন বলেন, “আমরা জানি সে কৃষক না ব্যবসায়ী, তারপরেও তার কাছে আমাদের সার বিক্রি করতে হচ্ছে।”
চৌগাছা উপজেলার ধুলিয়ানী ইউনিয়নের সার ডিলার মেসার্স রহমত স্টোরের সত্ত্বাধিকারী রহমতুল্লাহ বলেন, “আমার ইউনিয়নে সাব ডিলারের সংখ্যা ১৩ জন, কৃষকের সংখ্যা সাড়ে পাঁচ হাজারের বেশি। সরকারের নীতিমালা অনুযায়ী ৫০% সাব ডিলার, ৫০% সরাসরি কৃষকদের মাঝে বিক্রি করি। তবে চাহিদার তুলনায় সার অনেক কম পাচ্ছি। কিছু সার বিভিন্ন কারণে বাইরে বিক্রি করতে হয়।”
একই উপজেলার পাতিবিলা ইউনিয়নের মেসার্স ফরিদুল ইসলাম এন্টারপ্রাইজের সত্ত্বাধিকারী ফরিদুল ইসলাম বলেন, “আমার ইউনিয়নে মোট সাব ডিলার ১০ জন। আমার সারের তেমন সমস্যা হয় না। তবে আমাদের ডিলারদের মধ্যে অনেক ডিলার আছে যারা সার কৃষকের মাঝে বিক্রির কথা থাকলেও খোলা বাজারে অধিক লাভের কারণে বিক্রি করে দিচ্ছে।”
তিনি আরও বলেন, অনেকেই নামে মাত্র ডিলার তার সার তুলে অন্য খানে বিক্রি করে দিচ্ছে। পরিচয় প্রকাশে অনিচ্ছুক এক অনুমোদনহীন ব্যবসায়ী বলেন, “ডিলাররা গুদাম থেকে সার ক্রয় করে ইউরিয়া ৫০ কেজি ১২৫০ টাকা, ডিএপি ৯৫০ টাকা, টিএসপি ১৩০০ টাকা, এমওপি ৯০০ টাকা। ডিলার পয়েন্ট থেকে সাব ডিলার ক্রয় করে ইউরিয়া ১৩৩০ টাকা, ডিএপি ৯৮০ টাকা, টিএসপি ১৩৩০ টাকা, এমওপি ৯৫০ টাকা। খুচরা পর্যায়ে কৃষক ক্রয় করে ইউরিয়া ১৩৫০ টাকা, ডিএপি ১০৫০ টাকা, টিএসপি ১৩৫০ টাকা, এমওপি ১০০০ টাকা। কিন্তু আমরা যখন ডিলারদের থেকে সার ক্রয় করি, কৃষক যে মূল্যে সার ক্রয় করে তার থেকে প্রতি বস্তায় ৫০ থেকে ৬০ টাকা বেশি দিয়ে সার ক্রয় করি। আমাদের কোনো পাকা ক্যাশ মেমো দেওয়া হয় না।”
তিনি আরও বলেন, _“কৃষি বিভাগের লোকজন যখন বাজার মনিটরিং করতে আসে, আগে ভাগেই জানতে পারি এবং দোকান বন্ধ করে চলে যাই। আমি খোলা বাজারে বিক্রি করছি ইউরিয়া ৫০ কেজি ১৪৫০ টাকা, ডিএপি ১১৫০ টাকা, টিএসপি ১৬০০ টাকা, এমওপি ১১৫০ টাকা। যেমন কিনছি তেমন বিক্রি করছি।”
সরেজমিনে অনুসন্ধানে জানা যায়, চৌগাছা উপজেলার পাশাপোল বাজারের মেসার্স মোনোয়ারা ট্রেডিং, মালিগাতী বাজারের মেসার্স চৌধুরী ট্রেডার্স, ফুলসারা ইউনিয়নের আব্দুল্লাহ্ ট্রেডার্স, সুখপুকুরি ইউনিয়নের মেসার্স হোসেন ট্রেডার্স, সদর উপজেলার শরিফুল ট্রেডার্স, মনিরামপুরের লিটন এন্টারপ্রাইজ, বাঘারপাড়ার মোল্যা এন্টারপ্রাইজ ও সেলিম ট্রেডার্স, ঝিকরগাছার মোস্তফা এন্টারপ্রাইজসহ জেলার অধিকাংশ বিসিআইসি ও বিএডিসি সার ডিলারের বিরুদ্ধে খোলা বাজারে সার বিক্রির অভিযোগ রয়েছে।
ফুলসারা, সলুয়া, সিংহঝুলি বাজার ও আশপাশের এলাকা ঘুরে দেখা যায়, সরকারি অনুমোদিত সাব-ডিলাররা কৃষকদের চাহিদা অনুযায়ী সরকার নির্ধারিত মূল্যে সার সরবরাহ করতে হিমশিম খাচ্ছেন। অথচ একই এলাকায় মল্লিক ট্রেডার্স, সদ্দার ট্রেডার্স, বিল্লাল ট্রেডার্স সহ অন্যান্য ব্যবসায়ীর কাছে খোলা বাজারে তুলনামূলক বেশি দামে সহজেই সার পাওয়া যাচ্ছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক সাব-ডিলার জানান, “আমরা বর্তমানে চরম সংকটে আছি। কৃষক পর্যায়ে ৫০ কেজি ইউরিয়ার সরকারি খুচরা মূল্য ১,৩৫০ টাকা। কিন্তু ডিলারদের কাছ থেকে অনেক সময় ক্যাশ মেমো ছাড়াই ১,৩৪০ টাকায় সার সংগ্রহ করতে হয়। এর সঙ্গে পরিবহন খরচ বাবদ আরও ১৫ থেকে ২০ টাকা যোগ হয়। ফলে সরকারি নির্ধারিত মূল্যে কৃষকদের কাছে সার বিক্রি করা আমাদের জন্য প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে।”
বিএডিসি ও কৃষি বিভাগের তথ্য বলছে, জেলার নয়টি গুদামের মোট ধারণক্ষমতা ১৩ হাজার ৫০ মেট্রিক টন। কিন্তু বর্তমানে সেখানে ধারণক্ষমতার প্রায় দ্বিগুণ ২৪ হাজার মেট্রিক টন নন-ইউরিয়া সার মজুদ রয়েছে। ইউরিয়ার মজুদও প্রয়োজনের তুলনায় অনেক বেশি।
গত জুন মাসে ডিলারদের মধ্যে ২ হাজার ১০ মেট্রিক টন ইউরিয়া, ৮০৮ মেট্রিক টন টিএসপি, ১ হাজার ৭৫৬ মেট্রিক টন ডিএপি এবং ১২৩ মেট্রিক টন এমওপি বিতরণ করা হয়েছে। জুলাই মাসের জন্যও ডিএপি, টিএসপি ও এমওপির উল্লেখযোগ্য মজুদ লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।
অর্থাৎ সরকারি হিসাবে সারের কোনো ঘাটতি নেই। কিন্তু মাঠ পর্যায়ের সাব-ডিলারদের দাবি, তারা প্রয়োজনের ২০ শতাংশও সার পাচ্ছেন না।
সরকার প্রতি কেজি সারে বড় অঙ্কের ভর্তুকি দিচ্ছে। আন্তর্জাতিক বাজারে যে সার ৮০ থেকে ১০০ টাকা কেজি, সেটি কৃষকদের জন্য ২০ থেকে ২৭ টাকায় সরবরাহের ব্যবস্থা রয়েছে। কিন্তু সেই সুবিধা পাচ্ছেন না কৃষকরা।
কৃষকদের অভিযোগ, সরকারি ২৭ টাকার ইউরিয়া ৩৫ টাকা, ২১ টাকার ডিএপি ৩০ টাকা, ২০ টাকার এমওপি ৩০ টাকা এবং ২৫ টাকার টিএসপি ৪০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে।
মনিরামপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মাহমুদা আক্তার বলেন, “আমাদের প্রতিটি ডিলার ও সাব ডিলার পয়েন্টে সহকারী ও উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তাদের ফোন নম্বর দেওয়া আছে। ন্যায্য দামের চেয়ে বেশি দাম দিলে ফোন করে জানাতে ও ক্যাশ মেমো নিতে বলা হয়েছে। কোনো কৃষক অভিযোগ করলে সাথে সাথে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করব।”
অনুমোদনহীন সার ব্যবসায়ীদের বিষয়ে জানতে চাইলে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, যশোরের উপ-পরিচালক মোশাররফ হোসেন* বলেন, _“প্রতিনিয়ত আমাদের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা এবং আমি নিজে মাঠে থেকে সার ও বালাইনাশকের দোকান মনিটরিং করছি। বর্তমানে সারের কোনো সমস্যা বা সংকট নেই। এখন মাঠে সারের চাহিদা অনুযায়ী সার বিতরণ করা হয়েছে। যদি কোথাও কোনো সমস্যা থাকে, কৃষক বা কেউ জানালে সাথে সাথে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
কৃষি অর্থনীতিবিদরা বলছেন, সার বিতরণে স্বচ্ছতা না থাকলে ভর্তুকির সুফল কৃষক পাবে না। ডিলার-সাবডিলার নিয়োগ, বরাদ্দ ও বিতরণে ডিজিটাল মনিটরিং, প্রতিটি বস্তায় কিউআর কোড এবং অভিযোগের জন্য হটলাইন চালু করা জরুরি। পাশাপাশি অনুমোদনহীন দোকানের বিরুদ্ধে নিয়মিত ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করতে হবে।
গুদামে সার, নীতিমালায় কড়াকড়ি, তবুও খোলা বাজারে সারের ছড়াছড়ি। ডিলার থেকে সাব-ডিলার হয়ে অনুমোদনহীন দোকানদার পর্যন্ত পৌঁছানো এই সারের চেইন ভাঙতে না পারলে সরকারের ভর্তুকি আর কৃষকের ঘাম দুটোই বৃথা যাবে।