প্রিন্ট এর তারিখঃ সোমবার ০৩ আগস্ট ২০২৬, ১৯ শ্রাবণ ১৪৩৩


জেলা খবর

যশোরে ভবদহের জলাবদ্ধতা: স্থায়ী সমাধানে টিআরএম বাস্তবায়নের দাবিতে যশোর ডিসি অফিসে গণঅবস্থান

প্রকাশিত: ২০২৬-০৮-০৩ ১৮:১২:৫৬

News Image

যশোর প্রতিনিধি
যশোরে ভবদহ অঞ্চলের দীর্ঘ সাড়ে চার দশকের ভয়াবহ জলাবদ্ধতার স্থায়ী সমাধান এবং পানিবন্দী মানুষের জীবন-জীবিকা রক্ষার দাবিতে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সামনে গণঅবস্থান কর্মসূচি পালন করেছেন দুর্গত জনপদের প্রতিনিধিরা। ভবদহ পানি নিষ্কাশন সংগ্রাম কমিটির আহ্বানে আয়োজিত এই গণঅবস্থানে একাত্মতা প্রকাশ করে অংশ নেয় ‘কৃষক মুক্তি সংগ্রাম’-এর নড়াইল-যশোর শাখা কমিটি। অবস্থান কর্মসূচি শেষে প্রতিনিধিদল পানিসম্পদ মন্ত্রী বরাবর একটি স্মারকলিপি প্রদান করেন।

 

স্মারকলিপিতে তুলে ধরা হয়, যশোরের মণিরামপুর, কেশবপুর, অভয়নগর এবং পার্শ্ববর্তী খুলনার ফুলতলা ও ডুমুরিয়া উপজেলার শতাধিক গ্রামের বাড়িঘর, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, হাট-বাজার, রাস্তাঘাট এবং হাজার হাজার একর ফসলের জমি এখন পানির নিচে। প্রতিদিন প্লাবনভূমির পরিধি বৃদ্ধি পাওয়ায় অঞ্চলজুড়ে চরম মানবিক বিপর্যয় দেখা দিয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, ষাটের দশকে জনমতের তোয়াক্কা না করে চাপিয়ে দেওয়া 'কর্ডন পলিসি' এবং জনগণের উদ্ভাবিত টিআরএম (টাইডাল রিভার ম্যানেজমেন্ট) পদ্ধতিকে নস্যাৎ করার ফলেই আজ এই দুর্দশা। গত ৪৫ বছরে কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে একের পর এক প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হলেও তার সুফল মেলেনি; বরং প্রাকৃতিক পরিবেশ ধ্বংস হয়ে সৃষ্টি হয়েছে স্থায়ী জলাবদ্ধতা।

 

আন্দোলনকারীদের মতে, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের পানিসম্পদ উপদেষ্টা সরেজমিনে এসে টিআরএম বাস্তবায়ন, আমডাঙ্গা খাল প্রশস্থকরণ ও নদী খননের আশ্বাস দিলেও দীর্ঘসূত্রিতার কারণে তা ভেস্তে যেতে বসেছে। গণঅবস্থানে তারা তিনটি প্রধান বিষয় তুলে ধরেন।

 

 অভয়নগরের আমডাঙ্গা খাল সংস্কার করা হলে একাই ২৫ শতাংশ পানি নিষ্কাশন সম্ভব হতো। কার্যাদেশ দেওয়ার দুই বছর পার হলেও অজ্ঞাত কারণে এর কাজ শুরু হয়নি।

 

নদী খননে কারিগরি ত্রুটি ও পলি ভরাটে ১৪০ কোটি টাকা ব্যয়ে ৮১.৫ কিলোমিটার হরি ও ভদ্রা নদী খননের কাজ অসম্পূর্ণ রয়ে গেছে। ২০২৫ সালের ৩০ ডিসেম্বর খর্ণিয়া ব্রিজের দক্ষিণে বাঁধ দেওয়ায় খর্ণিয়া থেকে কুলবাড়িয়া পর্যন্ত ৭ কিলোমিটার নদী পলি জমে ভরাট হয়ে গেছে। বর্ষায় আঁড়বাঁধ অপসারিত না হওয়ায় এবার প্লাবনের মাত্রা বহুগুণ বেড়েছে।

 

টিআরএম নিয়ে ষড়যন্ত্র সিজিআইএস, আইডব্লিউএম এবং ডেল্টা প্ল্যান-২১০০ সহ প্রতিটি গবেষণায় টিআরএম-কে ভবদহের একমাত্র দীর্ঘমেয়াদী সমাধান হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। ২০২৬ সালের মে মাসে আইডব্লিউএম-এর জরিপে ৯৭ শতাংশ মানুষ টিআরএম-এর পক্ষে মত দিলেও একটি স্বার্থান্বেষী কুচক্রী মহল এ উদ্যোগ বানচালের চক্রান্ত করছে।

 

আন্দোলনে পূর্ণ সংহতি জানিয়ে কৃষক মুক্তি সংগ্রামের নড়াইল-যশোর শাখা কমিটির নেতৃবৃন্দ বলেন, ভবদহের পানি নিষ্কাশন কোনো করুণা নয়, এটি কৃষক-জনতার বাঁচা-মরার অধিকার।

 

সংগঠনটি অভয়নগরের কালিশাকুল, মশিয়াঘাটী, বালিধা, পঞ্চকরী, কোটা, সুন্দলী, আরপাড়া, ডুমুরতলা; মণিরামপুরের লখাইডাঙ্গা, সুজাতপুর, বাজেকুলটিয়া, হাটগাছা, কপালিয়া, কুলটিয়া, নেহালপুর এবং কেশবপুরের খুকশিয়া, ডুমুরখালি ও ভড়তি বিলসংলগ্ন এলাকার শতাধিক কৃষক প্রতিনিধিকে সংগঠিত করে আন্দোলনে অংশ নেয়। তারা স্পষ্ট হুঁশিয়ারি দেন, জনদুর্ভোগ নিয়ে কোনো টালবাহানা মেনে নেওয়া হবে না।

 

অবস্থান কর্মসূচি থেকে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য ৪টি প্রধান দাবি পেশ করা হয়।

 

টিআরএম বাস্তবায়ন আইডব্লিউএম (IWM)-এর প্রস্তাবনা অনুযায়ী নদী খননের সাথে একযোগে বিলে বিলে পর্যায়ক্রমে টিআরএম চালু করা।

 

আমডাঙ্গা খাল দ্রুত প্রশস্ত ও সংস্কার করা এবং কাজের বিলম্বের সাথে জড়িতদের শাস্তি প্রদান। খর্ণিয়াসহ সকল আঁড়বাঁধ দ্রুত সরিয়ে ফেলা এবং খর্ণিয়া থেকে কুলবাড়িয়া পর্যন্ত জমা হওয়া ৭ কিলোমিটার পলি অপসারিত করা।

 

পানিবন্দী হাজার হাজার মানুষের জন্য পর্যাপ্ত খাদ্য, বিশুদ্ধ পানি, স্বাস্থ্যসেবা ও চিকিৎসাসামগ্রী সরবরাহ করা।

 

ভবদহ অঞ্চলের সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনা করে অবিলম্বে পানিসম্পদ মন্ত্রীকে সরেজমিনে এলাকা পরিদর্শন করার এবং দুর্গত মানুষদের বাঁচাতে জরুরি হস্তক্ষেপর আহ্বান জানিয়েছেন আন্দোলনকারীরা।