প্রিন্ট এর তারিখঃ মঙ্গলবার ২১ জুলাই ২০২৬, ৬ শ্রাবণ ১৪৩৩


জেলা খবর

সুগন্ধের আড়ালে অসীম সম্ভাবনা: যশোরে 'সবুজ সোনা' চন্দনের বাণিজ্যিক বিপ্লব

প্রকাশিত: ২০২৬-০৭-২১ ২৩:০৬:২৮

News Image

উবাঈদুল হুসাইন আল্-সামি, যশোর প্রতিনিধি:
যশোরের চলতি বৃক্ষমেলায় সারি সারি গাছে ঘেরা মেলা প্রাঙ্গণে হাঁটার সময় হঠাৎই একটি ছোট্ট চারার ওপর চোখ আটকে যায় সাধারণ দর্শনার্থীদের। আর দশটি সাধারণ উদ্ভিদের মতো সবুজ পাতা ঘেরা গাছটি দেখতে আর পাঁচটা চারার মতো হলেও এতে নেই কোনো তাৎক্ষণিক তীব্র ঘ্রাণ। অথচ অভিজ্ঞ বৃক্ষপ্রেমী ও নার্সারি মালিকরা চারাটির অনন্য বৈশিষ্ট্যের কথা জানানোর পর সবার চোখ ছানাবড়া হয়ে ওঠে। সামান্য একটি চারা উদ্ভিদের দাম হাঁকা হচ্ছে কয়েক হাজার টাকা। নিছক কৌতূহল থেকেই যখন জানার চেষ্টা করা হলো—কেন এই ছোট্ট গাছের এতো কদর? উত্তর পাওয়া গেল ধর্ম, ইতিহাস, অর্থনীতি ও আধুনিক উদ্ভিদবিজ্ঞানের নানামুখী বিশ্লেষণে। এটি সাধারণ কোনো গাছ নয়, এটি বিশ্ববাজারে অন্যতম অমূল্য সম্পদ হিসেবে স্বীকৃত 'শ্বেতচন্দন'।

 

বিজ্ঞানীদের তথ্য অনুযায়ী, পৃথিবীতে প্রায় চার লাখ প্রজাতির উদ্ভিদ রয়েছে। তবে সুগন্ধি, ঔষধি ও উচ্চ অর্থকরী গুণসম্পন্ন গাছের সংখ্যা খুব একটি বেশি নয়। এই বিরল উদ্ভিদের তালিকার একেবারে শীর্ষ সারিতে স্থান করে নিয়েছে চন্দন গাছ। উদ্ভিদবিজ্ঞানের ভাষায় যার নাম **Santalum album**। একে সাধারণ মানুষের ভাষায় 'শ্বেতচন্দন'ও বলা হয়ে থাকে। স্বাভাবিক গাছের চেয়ে চন্দনের জীবনের ধরন সম্পূর্ণ আলাদা। এটি একটি আধা-পরজীবী উদ্ভিদ। অর্থাৎ, চন্দন গাছ একা একা মাটিতে পুষ্টি তৈরি করে পুরোপুরি বেঁচে থাকতে পারে না; বেঁচে থাকার জন্য এর শিকড় পাশের অন্য গাছের শিকড়ের সাথে যুক্ত হয়ে সেখান থেকে প্রয়োজনীয় খাদ্য ও উপাদান গ্রহণ করে। সাধারণত ১৫ থেকে ২০ বছর বয়স হলে চন্দন গাছের মূল কাণ্ড এবং শিকড়ের ভেতরের অংশে সুগন্ধি তেল তৈরি হতে শুরু করে। একটি চন্দন গাছ প্রকৃতিতে ৬০ থেকে প্রায় ১০০ বছর পর্যন্ত বেঁচে থাকতে পারে, তবে বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে সাধারণত ১৫ থেকে ২০ বছরের মাথায় এটি কাটার জন্য উপযোগী বলে ধরা হয়।

 

চন্দনের মহিমা কেবল অর্থনৈতিক মূল্যেই সীমাবদ্ধ নয়, ধর্মীয় ও সামাজিক বিশ্বাসের সাথেও এটি গভীরভাবে জড়িত। হিন্দু ধর্মে চন্দনকে বিবেচনা করা হয় পবিত্রতার এক মহান প্রতীক হিসেবে। দেব-দেবীর পূজা, প্রতিমার গায়ে তিলক আঁকা, চন্দনের মালা কিংবা সুগন্ধি ধূপ-আগরবাতির প্রধান কাঁচামাল এই গাছ। একই সাথে বৌদ্ধ ও জৈন ধর্মের বিভিন্ন ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানেও চন্দন কাঠের ব্যবহার সুপ্রাচীন। এছাড়া মুসলিম ঐতিহ্যে বিশ্বখ্যাত ও ঐতিহ্যবাহী প্রাকৃতিক আতর তৈরিতে চন্দনের নির্যাস তেলের দীর্ঘ ব্যবহারের ইতিহাস রয়েছে।

 

"চন্দন শুধু সুবাস ছড়ায় না, বরং মানুষের মন শান্ত ও প্রসন্ন করে"—এই আবহমান বিশ্বাস হাজার বছর ধরে চলে আসছে। আয়ুর্বেদ ও ইউনানি চিকিৎসায় চন্দনের ভূমিকা অপরিসীম। চর্মরোগ, তীব্র জ্বর, মাথাব্যথা এবং শারীরিক রক্তবর্ণ দূর করতে চন্দনের রস বা নির্জাস ব্যবহার করা হয়। বৈশ্বিক প্রসাধনী শিল্পে চন্দন তেলের চাহিদা সবসময় আকাশছোঁয়া। বর্তমানে আন্তর্জাতিক বাজারে এক কেজি খাঁটি চন্দন তেলের দাম প্রায় লাখ টাকার উপরে। চন্দনের এই বহুমুখী ও চড়া মূল্যের কারণেই একে বিশ্বজুড়ে "সবুজ সোনা" বলে আখ্যা দেওয়া হয়।

 

বাংলাদেশে আবহাওয়া ও জলবায়ু চন্দন চাষের দারুণ উপযোগী হলেও দীর্ঘমেয়াদী পরিচর্যা ও সঠিক তদারকির অভাবে এখানে চন্দনের বাণিজ্যিক চাষ খুব বেশি সম্প্রসারিত হয়নি। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ভেষজ ও সুগন্ধি বৃক্ষের প্রতি সাধারণ মানুষ ও কৃষি গবেষকদের আগ্রহ বাড়ছে। বাংলাদেশ বন বিভাগ ও কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর কৃষকদের বিকল্প অর্থকরী ফসল হিসেবে চন্দন চাষে উৎসাহ জুগিয়ে আসছে।

 

যশোরের বৃক্ষমেলায় এমন একজন চন্দন চাষির দেখা মিলেছে, যিনি বাংলাদেশে শ্বেতচন্দনের বাণিজ্যিক প্রসার নিয়ে কাজ করছেন। তিনি যশোরের সাজ্জাদ হোসেন, যাকে এই অঞ্চলের শ্বেতচন্দন চারা উৎপাদনের অন্যতম পথিকৃৎ ধরা হয়। গত ১৬ বছর ধরে একনিষ্ঠভাবে চন্দন নিয়ে কাজ করছেন সাজ্জাদ।

 

নিজের অভিজ্ঞতা ও পরিকল্পনার কথা তুলে ধরে সাজ্জাদ হোসেন বলেন, "বেশিরভাগ মানুষ নার্সারিতে এসে ফল বা ফুলের গাছ খোঁজে। কিন্তু আমি চন্দনের দীর্ঘমেয়াদী ভবিষ্যৎ দেখে এই খাতে নেমেছি। সঠিক পরিচর্যা পেলে একটি গাছ ২০ বছর পর প্রায় ২০ থেকে ২৫ লাখ টাকায় বিক্রি হওয়া সম্ভব। সরকার যদি আমাদের মতো উদ্যোক্তাদের কারিগরি প্রযুক্তি ও প্রয়োজনীয় ভর্তুকি দেয়, তবে যশোর অঞ্চল চন্দন চাষের জন্য সারা দেশে একটি রোল মডেল হয়ে উঠতে পারে। আমি নিজে টিস্যু কালচারের মাধ্যমে চারা উৎপাদন করছি। যশোরে বর্তমানে এটিই একমাত্র শ্বেতচন্দন উৎপাদন কেন্দ্র।"

 

সাজ্জাদ হোসেন আরও জানান, প্রথমে তিনি বন বিভাগের কাছ থেকে একটি মাত্র চন্দন গাছ সংগ্রহ করে পরীক্ষা-নিরীক্ষা শুরু করেছিলেন। বর্তমানে তার নার্সারিতে ২ থেকে ৩ বছর বয়সী প্রায় চার হাজার চারা এবং ১০ থেকে ১১ বছর বয়সী কয়েক শত পূর্ণাঙ্গ গাছ রয়েছে। তিনি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে উপহার দেওয়ার জন্য ১৪ বছর বয়সী ২টি চারা সহ মোট ২০০০টি চারা প্রস্তুত করেছেন। তিনি মনে করেন, সঠিক পরিকল্পনা নিয়ে সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে চন্দন চাষ ছড়িয়ে দেওয়া গেলে দেশের অর্থনীতি লাভবান হবে।

 

যশোর ক্যান্টনমেন্ট কলেজের সমাজ বিজ্ঞান বিভাগের ফাইনাল বর্ষের ছাত্র সবুজ বৈরাগী বলেন, _"আমি  চন্দন কিনতে এসেছি। আমাদের সমাজে গাছ মানেই ফলজ বা বনজ। কিন্তু চন্দন একটা সংস্কৃতি। এটা বাড়িতে লাগালে ধর্মীয় কাজেও লাগবে আবার ভবিষ্যতে অর্থনৈতিকভাবেও লাভবান হওয়া যাবে। দাম দাম একদম নাগালের মধ্যে মাত্র ৪৪ দিনের চারা দাম নিলো ৫০ টাকা আমি মোট চারটি চারা কিনেছি, এটা একটা ইনভেস্টমেন্ট।"

 

আরেক দর্শনার্থী অরনিমা বলেন, _"আমি প্রথমে ভেবেছি এটা শো-পিস গাছ। পরে জানলাম এর তেল দিয়ে পারফিউম হয়। আমার ঠাকুমা পুজোয় চন্দন বাটতেন। সেই স্মৃতি থেকেই একটা চারা নিলাম। যদি বাঁচাতে পারি, ২০ বছর পর নিজের গাছের চন্দন দিয়েই পুজো দিব।"

 

যশোর সরকারি মাইকেল মধুসূদন দত্ত কলেজের উদ্ভিদ বিজ্ঞান  বিভাগের প্রফেসর এস.এম আইয়ূব হোসেন বলেন, _"চন্দন বাংলাদেশের জন্য সম্ভাবনাময় একটি অর্থকরী বৃক্ষ। এটি খরা সহনশীল এবং অনুর্বর জমিতেও হয়। তবে চাষিদের প্রশিক্ষণ দরকার। কারণ এটা ৫-৭ বছর পর্যন্ত কোনো আয় দেয় না। সরকার যদি দীর্ঘমেয়াদী লোন ও বাজারজাতকরণের নিশ্চয়তা দেয়, তাহলে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের অনেক বেকার যুবক এই খাতে আসতে পারবে। এছাড়া চন্দন পরিবেশের জন্যও ভালো, কার্বন শোষণ করে।"

 

তিনি আরও বলেন, 'বিশেষ করে সনাতনী ধর্মের মানুষের কাছে চন্দনের ধর্মীয় গুরুত্ব অনেক, মৃত মানুষকে দাহ্য করা, পূজা উদযাপনের ব্যবহার করা হয। প্রাচীনকাল থেকে এখন পর্যন্ত মানুষের চোখ ওঠা বা ভাইরাস লাগলে চোখ রক্তবর্ণ হয়ে গেলে তখন চন্দন গাছের নির্জাস ঔষধ হিসাবে ব্যবহার হয়। এটার ব্যপক উপকার রয়েছে। মুসলিমদের আতর, সুগন্ধি তৈরিতে চন্দন গাছের নির্জাস ব্যবহার করা হয়। জেনেটিক রিসোর্স সংরক্ষণের জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে চন্দন নিয়ে গবেষণা শুরু করা প্রয়োজন।

 

চন্দনের ভবিষ্যৎ উজ্জ্বল। বিশ্ববাজারে চাহিদা বাড়ছে, দামও বাড়ছে। কিন্তু চ্যালেঞ্জও কম নয়। প্রথমত সময়। ২০ বছর অপেক্ষা করতে হবে। দ্বিতীয়ত নিরাপত্তা। দামি গাছ হওয়ায় চুরির আশঙ্কা। তৃতীয়ত নীতি সহায়তা।'

 

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সরকার যদি চন্দনকে "উচ্চমূল্যের ঔষধি বৃক্ষ" হিসেবে প্রণোদনা দেয়, ব্যাংক লোন সহজ করে এবং রপ্তানির সুযোগ তৈরি করে, তাহলে যশোরসহ সারাদেশে চন্দন বিপ্লব হতে পারে। সাজ্জাদ হোসেনের মতো উদ্যোক্তারাই তখন হয়ে উঠবেন "সবুজ সোনার" কারিগর।

 

বৃক্ষমেলা শেষে বাড়ি ফেরার সময় ভাবছিলাম—একটা ছোট্ট চারা। আজ যার দাম কয়েক টাকা। ২০ বছর পর সেটাই হবে লক্ষ টাকার সম্পদ, আবার হবে ধর্মীয় আচারের অবিচ্ছেদ্য অংশ। 

 

চন্দন গাছ আমাদের শেখায়, ধৈর্যের ফল মিষ্টি হয়। আর সুগন্ধ ছড়াতে হলে আগে শিকড় গাড়তে হয়।