প্রিন্ট এর তারিখঃ বুধবার ১৭ জুন ২০২৬, ৩ আষাঢ় ১৪৩৩
প্রকাশিত: ২০২৬-০৬-১৭ ২২:৩২:২৭
উবাঈদুল হুসাইন আল্ সামি, যশোর প্রতিনিধি:
এক সময় গ্রাম বাংলার আনাচে কানাচে যা ছিল নিত্যদিনের ফল, সময়ের সঙ্গে তা হারিয়ে যেতে বসেছিল। সেই হারিয়ে যাওয়া গ্রীষ্মকালীন ফল এখন আবার ফিরে এসেছে যশোরের বাজারে। আম, লিচু, কাঁঠাল, জাম, তরমুজ, বাঙ্গি, তাল, জামরুল, আনারস, পেঁপে, বেল, সফেদা, পেয়ারা, লটকন, ডেউয়া, দেশি খেজুর, কাউফল ইত্যাদিতে সরগরম এখন যশোর চৌরাস্তা, দড়াটানা, পালবাড়ি, মনিহার ও নিউমার্কেট ফলের হাট। বর্ষার শুরুতে গ্রীষ্মের এই ফলের সমাহার শুধু ক্রেতার রসনা মেটাচ্ছে না, চাঙা করছে স্থানীয় কৃষক, পাইকার ও খুচরা ব্যবসায়ীর অর্থনীতিও।
এ বছর আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় ফলনের পরিমাণও ভালো। যশোর মনিহার পাইকারি আড়তে সকাল থেকেই ট্রাক, ভ্যান আর পিকআপে আসছে সাতক্ষীরা, খুলনা, চুয়াডাঙ্গা, মেহেরপুর ও স্থানীয় এলাকার ফল। ডালায় সাজানো লালচে জাম, পাকা কাঁঠালের গন্ধ, তালের শাঁস, ডেউয়ার টক মিষ্টি স্বাদ আর কাউফলের হলুদ আভা দেখে শহরের মানুষ ভিড় করছেন।

পাইকারি ব্যবসায়ী শাহ-আলম সাতক্ষীরা থেকে প্রতিদিন ভোরে ফল নিয়ে আসেন যশোর চৌরাস্তায়। তিনি বলেন, “আমরা বিভিন্ন সময় বিভিন্ন জায়গায় গিয়ে কৃষকদের কাছ থেকে সরাসরি ফল সংগ্রহ করি। মাঝে দালাল কম থাকায় কৃষকও ন্যায্য দাম পাচ্ছে, আমরাও লাভ করতে পারছি। এবার আম, লিচু, জামের ফলন ভালো। বাঙ্গি আর তরমুজের চাহিদা বেশি গরমের জন্য।”
খুচরা বিক্রেতা জামিল হোসেন বলেন, “আগে শুধু আম আর কাঁঠালই মানুষ কিনত। এখন মানুষ বৈচিত্র্য খুঁজছে। জামরুল, সফেদা, দেশি খেজুর, ডেউয়া, কাউফলের কদর বেড়েছে। দাম একটু বেশি হলেও ক্রেতারা নিচ্ছে। এক কেজি জাম বিক্রি করি ১৫০ থেকে ২০০ টাকায়, ডেউয়া ৮০ টাকা কেজি, কাউফল ১১০ টাকা কেজি।”
যশোর বেজপাড়ার বাসিন্দা রাহিমা খাতুন ব্যাগ ভর্তি ফল নিয়ে বাসায় ফিরছিলেন। তিনি বলেন, “ছোটবেলায় দাদাবাড়ির গাছ থেকে পেড়ে জাম আর ডেউয়া খেতাম। শহরে এসে এসব ফল পেতাম না। এখন বাজারে দেখে খুব ভালো লাগছে। দাম একটু বেশি হলেও কিনছি। বাচ্চারা তালের শাঁস আর জামরুল খুব পছন্দ করে।”
ঝুমঝুমপুর এলাকার ইয়ার আলী বলেন, “আমাদের এলাকায় আগে অনেক বেল আর তাল গাছ ছিল। এখন গাছ কেটে ফেলায় ফল পাওয়া যায় না। বাজারে দেখে নস্টালজিয়া কাজ করে। দেশি ফল খেলে শরীরও ভালো থাকে, দামও বিদেশি ফলের তুলনায় কম।”

গ্রীষ্মকালীন ফলের এই বাজারে শুধু বিক্রি নয়, কর্মসংস্থানও তৈরি হচ্ছে। বাগান থেকে ফল তোলা, প্যাকেজিং, পরিবহন, আড়তদারি, খুচরা বিক্রি সব মিলিয়ে হাজারো মানুষের আয়ের উৎস এখন এই মৌসুমি ফল।
যশোর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, জেলায় এবার আমের উৎপাদন প্রায় ১ লাখ ৮০ হাজার মেট্রিক টন। লিচুর ফলনও বিগত বছরের চেয়ে ১৫ শতাংশ বেশি। কাঁঠাল, জাম, বাঙ্গি ও তরমুজের চাষও সম্প্রসারিত হয়েছে। চাষিরা এখন রাসায়নিক সারের পাশাপাশি জৈব সার ব্যবহার করছেন, ফলে ফলের গুণগত মান ভালো হচ্ছে।
সাতক্ষীরা, খুলনা ও যশোরের কৃষকরা জানান, সরাসরি বাজারে ফল বিক্রি করতে পারায় মধ্যস্বত্বভোগীর দৌরাত্ম্য কমেছে। মোবাইল ব্যাংকিং ও নগদ লেনদেনের কারণে টাকা হাতে পেতে দেরি হয় না। এতে কৃষকেরা উৎসাহ পেয়ে বাগান সম্প্রসারণ করছেন।
ফলের দাম নির্ভর করছে যোগান ও চাহিদার ওপর। বাজারে এখন আম বিক্রি হচ্ছে ৬০ থেকে ১২০ টাকা কেজি, জাতভেদে দাম ভিন্ন। লিচু তিন শত থেকে পাচ শত টাকা এক শত পিচ, কাঁঠাল এক শত থেকে দুই শত টাকা প্রকার ভেদে কমবেশি। তরমুজ পিস ১শ থেকে দুইশত টাকা। বাঙ্গি একশত থেকে দেড়শত টাকা পিচ। তালের শাঁস ১০ টাকা পিস। জামরুল ৮০ টাকা কেজি। আনারস ও পেঁপে সারাবছর পাওয়া গেলেও গ্রীষ্মে দাম তুলনামূলক কম।
পাইকারি আড়ত থেকে খুচরা দোকান পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে ৫ থেকে ১০ শতাংশ লাভ যোগ হচ্ছে। পরিবহন খরচ, প্যাকেজিং ও অপচয় বাদ দিলেও ব্যবসায়ীরা লাভবান হচ্ছেন।
চিকিৎসকরা বলছেন, গ্রীষ্মের এই দেশি ফল শরীরের জন্য অত্যন্ত উপকারী। জামে রয়েছে অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট, যা ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য ভালো। ডেউয়া ও কাউফলে ভিটামিন সি ও ফাইবার বেশি, যা হজমে সাহায্য করে। তালের শাঁস ও বাঙ্গি শরীর ঠান্ডা রাখে। বেলের শরবত পেটের সমস্যায় উপকারী।
যশোরেরে সিভিল সার্জন ডা. মাসুদ রানা বলেন, “বাজারের ফল কেনার সময় খেয়াল রাখতে হবে যেন কেমিক্যাল দিয়ে পাকানো না হয়। ধুয়ে খেলে ঝুঁকি কম। দেশি ফল খাওয়ার অভ্যাস বাড়লে আমদানি করা ফলের ওপর নির্ভরতা কমবে, বৈদেশিক মুদ্রাও সাশ্রয় হবে।”
যশোর বিজ্ঞান প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের খাদ্য ও পুষ্টি বিজ্ঞান বিভাগের সহকারী অধ্যাপক তানভির আহম্মেদ বলেন, হাজার হাজার বছর ধরে মানুষ এই সব ফল আহার করে বিভিন্ন ভাবে গ্রীষ্মকালীন ফল যেমন—আম, কাঁঠাল, লিচু, তরমুজ, জাম এবং বেল শুধু সুস্বাদুই নয়, বরং বিভিন্ন রোগ প্রতিরোধ ও চিকিৎসায় থেরাপিউটিক বা ঔষধি খাদ্য হিসেবে গ্রহণ করছে।
পানিশূন্যতা ও ইলেকট্রোলাইট ব্যালেন্স তীব্র গরমে তরমুজ (৯২% পানি) এবং বাঙ্গি শরীরকে হাইড্রেটেড রাখে। এতে থাকা পটাশিয়াম ও সাইট্রুলিন উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ করে এবং হৃদযন্ত্রের কার্যকারিতা সচল রাখে।
হজম ও পেটের পীড়া দূরীকরণে পাকা বেল এবং তালের খাদ্য-আঁশ (ফাইবার) দীর্ঘদিনের কোষ্ঠকাঠিন্য ও পাইলসের সমস্যা দূর করে। কাঁচা বেল আমাশয় ও ডায়রিয়ার চিকিৎসায় অত্যন্ত কার্যকর। আনারসের 'ব্রোমেলিন' এনজাইম প্রোটিন পরিপাকে সাহায্য করে।
ডায়াবেটিস ও রক্তস্বল্পতা নিয়ন্ত্রণে কালোজামে শর্করার পরিমাণ কম এবং এর অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে। জাম ও তরমুজে থাকা আয়রন রক্তাল্পতা বা অ্যানিমিয়া দূর করতে ভূমিকা রাখে।
রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা ও ক্যানসার প্রতিরোধে আম ও কাঁঠালে প্রচুর বিটা-ক্যারোটিন (ভিটামিন এ) এবং ভিটামিন সি থাকে, যা চোখের রাতকানা রোগ প্রতিরোধ করে এবং শরীরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা শক্তিশালী করে। আমের অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট ও লাইকোপিন উপাদান কোলন, স্তন ও প্রোস্টেট ক্যানসারের ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করে।
প্রাকৃতিক পুষ্টি উপাদানে ভরপুর এসব মৌসুমি ফল আমাদের শরীরের অভ্যন্তরীণ চিকিৎসায় ওষুধের মতো কাজ করে।
কৃষি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এক সময় গ্রামে বাড়ির আঙিনায়, রাস্তার ধারে, পুকুরপাড়ে ডেউয়া, কাউফল, জামরুল, দেশি খেজুরের গাছ ছিল। নগরায়ণ ও আধুনিক চাষের কারণে এসব গাছ কমে গিয়েছিল। এখন জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে কৃষকরা আবার এসব সহনশীল ফলের দিকে ঝুঁকছেন। এসব গাছে সার-কীটনাশক কম লাগে, খরা-লবণাক্ততা সহ্য করে।
যশোর চৌগাছা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা বলেন মোসাব্বির হুসাইন, “আমরা কৃষকদের বিভিন্ন ধরনের ফলজ চারা দিচ্ছি। বাড়ির আঙিনায় লাগানোর পরামর্শ দিচ্ছি। এসব ফলের বাজার মূল্য ভালো, চাহিদাও বাড়ছে।”
ব্যবসায়ীরা মনে করছেন, সঠিক সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াজাতকরণ হলে এই ফল দিয়ে বড় বাজার তৈরি করা সম্ভব। জাম থেকে জেলি, ডেউয়া থেকে আচার, বেল থেকে শরবত, তাল থেকে পিঠা তৈরি করে মূল্য সংযোজন করা যায়। যশোরের ভৈরব নদীর তীরে ফুড প্রসেসিং শিল্প গড়ে উঠলে কৃষক আরও লাভবান হবেন।
পাইকার শাহআলম বলেন, “যদি সরকার কোল্ড স্টোরেজ ও প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানা করে দেয়, তাহলে ফল নষ্ট কম হবে। আমরা সারা বছর ফল সরবরাহ করতে পারব। রপ্তানির সুযোগও আছে।”
তবে চ্যালেঞ্জও আছে। অসময়ে বৃষ্টি হলে ফল ঝরে পড়ে। পাকার সময় কেমিক্যাল ব্যবহারের প্রবণতা থাকে। বাজার মনিটরিং জোরদার না হলে ভেজাল ফল ক্রেতার কাছে চলে যাবে। পরিবহন ও সংরক্ষণের অভাবে ২০ থেকে ২৫ শতাংশ ফল নষ্ট হয় বলে ব্যবসায়ীরা জানান।
গ্রাম বাংলার হারিয়ে যাওয়া গ্রীষ্মকালীন ফল যশোরের বাজারে ফিরে আসা শুধু স্মৃতির জন্য নয়, এটি অর্থনীতির জন্যও আশীর্বাদ। কৃষক পাচ্ছে ন্যায্য দাম, ব্যবসায়ী পাচ্ছে লাভ, ক্রেতা পাচ্ছে পুষ্টি আর স্মৃতি। সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগ, কৃষকের আগ্রহ আর ক্রেতার চাহিদা মিললে এই মৌসুমি ফলই হয়ে উঠতে পারে যশোরের অর্থনীতির নতুন শক্তি।