প্রিন্ট এর তারিখঃ শনিবার ০৯ মে ২০২৬, ২৬ বৈশাখ ১৪৩৩


জেলা খবর

গাজীপুরের কাপাসিয়ায় স্ত্রী, শ্যালক ও তিন সন্তানসহ ৫ জনকে গলা কেটে হত্যার ঘটনায় আটক-২

প্রকাশিত: ২০২৬-০৫-০৯ ১৮:৪২:২৯

News Image

কাপাসিয়া (গাজীপুর) প্রতিনিধি:
গাজীপুরের কাপাসিয়ায় স্ত্রী, শ্যালক ও তিন সন্তানসহ ৫ জনকে গলা কেটে হত্যা করে পালিয়েছে ঘাতক ফোরকান। 

 

আজ ০৯ মে, ২০২৬ শনিবার (৯ মে) সকালে উপজেলার সদর ইউনিয়নের রাউৎকোনা গ্রামের সিঙ্গাপুর প্রবাসী মনির হোসেনের বাসা থেকে তাঁদের রক্তাক্ত মরদেহ উদ্ধার করেছে থানা পুলিশ। মর্মান্তিক এই ঘটনার খবরে শত শত মানুষ ঘটনাস্থলে ভীর জমান। 

 

এ ঘটনায় পুরো এলাকায় শোক ও চরম আতঙ্ক বিরাজ করছে। ঘাতক ফোরকান মিয়া পরিকল্পিত ভাবে হত্যাকাণ্ড ঘটিয়ে পালিয়ে যাবার সময় আবু মুসা নামে তার এক চাচাতো ভাইকে ফোন করে বিষয়টি জানান। খবর সে গাজীপুরের মাস্টার বাড়ি এলাকা থেকে ঘটনাস্থলে আসেন। 

 

নিহতরা হলেন, ঘাতক পলাতক ফোরকান মিয়ার স্ত্রী শারমিন খানম (৩০), মাদরাসায় পড়ুয়া তাঁদের বড় মেয়ে মীম খানম (১৫), মেজ মেয়ে উম্মে হাবিবা (৮), ছোট মেয়ে ফারিয়া (২) এবং শারমিনের ছোট ভাই রসুল মিয়া (২২)। নিহত শারমিনের পিতা শাহাদাৎ মোল্লার বাড়ি গোপালগঞ্জের পাইককান্দি এলাকায়। ফোরকানের গ্রামের বাড়ি গোপালগঞ্জ জেলা সদরের মেরী গোপীনাথপুর এলাকায়। সে ওই এলাকার আতিয়ার রহমান মোল্লার পুত্র। তিনি স্ত্রী ও সন্তানদের নিয়ে মনিরের বাড়ীর নিচ তলায় ভাড়া থাকতেন। 

 

নিহতদের মরদেহের পাশে ঘাতক মোঃ ফোরকান এর স্বাক্ষর হীন একটি কম্পিউটার টাইপকৃত সাধারণ ডাইয়েরী কপি পাওয়া যায়। এতে সে তার স্ত্রী শারমিন খানম এবং শশুড়, শাশুড়ি, শ্যালক সহ ১১ জনের বিরুদ্ধে তার ১০ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগ আনেন। তার স্ত্রীর মাধ্যমে তার শশুর বিভিন্ন সময়ে পর্যায়ক্রমে ১০ লাখ টাকা নিয়ে জমি ক্রয় করেন। টাকা ফেরত চাইলে তাদের সাথে মনোমালিন্য চলছিল। গত ৩ মে উল্লেখিত সবাই মিলে তাকে বাসায় আটকিয়ে শারীরিক ভাবে নির্যাতন করে এবং ভয়ভীতি ও প্রাণ নাশের হুমকি দেয় বলে অভিযোগ করেন। এছাড়া তার স্ত্রীর নিজ এলাকার মুকসুদপুরের খালাতো ভাই রাজু সহ অন্যান্যদের সাথে পরকিয়ায় লিপ্ত ছিল বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়।

 

পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, রাউৎকোনা গ্রামের প্রবাসী মনির হোসেনের বাড়ির নিচতলায় স্বপরিবারে ভাড়া থাকতেন পেশায় প্রাইভেটকার চালক ফোরকান মিয়া। শুক্রবার দিবাগত রাতের কোনো এক সময় এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। শনিবার সকালে ঘরের ভেতর মরদেহগুলো পড়ে থাকতে দেখে স্থানীয়রা পুলিশে খবর দেয়। পুলিশ এসে মরদেহগুলো উদ্ধার করেন। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, তিন সন্তানের গলাকাটা মরদেহ ঘরের মেঝেতে পাশাপাশি পড়ে ছিল। শারমিনের ভাই রসুলের মরদেহ ছিল বিছানার ওপর। মা শারমিনের হাত-মুখ বাঁধা মরদেহ জানালার গ্রিলের সাথে বাঁধা অবস্থায় দেখা যায়।

 

ঘাতকদের ভায়রা ভাই শামীম জানান, ফোরকান মিয়া শুক্রবার ফোন করে চাকুরী দেয়ার কথা বলে নিহত শ্যালক রসুল মিয়াকে কাপাসিয়া তার বাসায় নিয়ে আসেন। সে মাদকাসক্ত ছিলো বলে জানা যায়। তার বাসা থেকে মদের বোতল এবং ইয়াবা সেবনের উপকরণ পাওয়া গেছে। অসমর্থিত সূত্রে জানা যায়, স্বামী- স্ত্রীর মাঝে পারিবারিক কলহ ছিলো। গত কয়েক দিন আগে ঘাতক ফোরকান তার স্ত্রীকে মারধর করেন। পারিবারিক বিভিন্ন বিষয়ে তাদের মাঝে মনোমালিন্য ছিল। শারমিনের খালাতো ভাই সাজ্জাদ মিয়া জানান, মোবাইল ফোনে খবর পেয়ে তারা ঘটনাস্থলে আসেন। অনেক দিন যাবত তাদের মাঝে ঝগড়াঝাঁটি চলছিল। ইতিপূর্বে স্বজনরা তাদের বিভিন্ন বিষয়ে মিমাংশা করার চেষ্টা করেছেন। 

 

গাজীপুরের (কাপাসিয়া-কালীগঞ্জ) সার্কেল অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান হত্যাকাণ্ডের সত্যতা নিশ্চিত করে জানান, একই পরিবারের পাঁচজনকে নৃসংশভাবে হত্যা করা হয়েছে। কী কারণে এই হত্যাকাণ্ড ঘটেছে, তা উদ্ঘাটনে পুলিশ, পিবিআই, ডিবি, সিআইডি একযোগে কাজ শুরু করছেন। কাপাসিয়া থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) শাহীনুর আলম জানান, পলাতক ফোরকান মিয়া প্রাইভেট কার চালক। তিনি প্রায় এক বছর আগে রাউৎকোনা গ্রামের প্রবাসী মনির হোসেনের বাড়িতে বাসা ভাড়া নিয়ে স্ত্রী সন্তানসহ বসবাস করছিলেন। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে পারিবারিক কলহ বা অন্য যেকোনো জেরে ফোরকান মিয়া এই হত্যাকাণ্ড ঘটিয়ে পালিয়েছেন। ইতিমধ্যে সন্দেহভাজন দু'জনকে আটক করা হয়েছে। তদন্তের স্বার্থে তাদের নাম পরিচয় গোপন রাখা হয়েছে। 

 

কাপাসিয়া থানার পুলিশ পরিদর্শক (তদন্ত) যোবায়ের হোসেন জানান, মরদেহগুলো ময়নাতদন্তের জন্য গাজীপুর শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল মর্গে পাঠানোর প্রক্রিয়া চলছে। এ ঘটনায় মামলার প্রস্তুতি চলছে এবং প্রাথমিকভাবে অভিযুক্ত ফোরকান মিয়াকে গ্রেপ্তারে পুলিশের একাধিক টিম অভিযান শুরু করেছে। 

 

মর্মান্তিক এ হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় স্থানীয় সংসদ সদস্য মু. সালাহউদ্দিন আইউবী, গাজীপুর জেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক ও কাপাসিয়া উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক শাহ রিয়াজুল হান্নান, সদস্য সচিব ও উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান বীর মুক্তিযোদ্ধা আলহাজ্ব খন্দকার আজিজুর রহমান পেরা, কাপাসিয়া প্রেসক্লাবের সভাপতি এফ এম কামাল হোসেন, জেলা মহিলা দলের সভাপতি জান্নাতুল ফেরদৌসী, বিআরডিবি চেয়ারম্যান ও সদর ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি মোঃ সেলিম হোসেন আরজু, সাধারণ সম্পাদক আজগর হোসেন খান, ইউনিয়ন জামায়াতে ইসলামীর আমির মাওলানা মোঃ ফরহাদ হোসেন মোল্লাসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতৃবৃন্দ গভীর শোক ও শোক সন্তপ্ত পরিবারবর্গের প্রতি সমবেদনা জ্ঞাপন করেছেন। 

 

এছাড়া খবর পেয়ে উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) ডাঃ তামান্না তাসনীম, সহকারী কমিশনার (ভূমি) মোঃ নাহিদুল হকসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিভিন্ন বিভাগের সদস্যরা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন।