প্রিন্ট এর তারিখঃ রবিবার ১৯ এপ্রিল ২০২৬, ৬ বৈশাখ ১৪৩৩


আন্তর্জাতিক

ইরানের জব্দ হওয়া শত বিলিয়ন ডলার ঘিরে নতুন কূটনৈতিক টানাপোড়েন

প্রকাশিত: ২০২৬-০৪-১৯ ১৩:৪৫:২০

News Image

ছবি: এআই

আশরাফুর রহমান, তেহরান থেকে 
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে দ্বিতীয় দফা আলোচনার প্রস্তুতি যত এগোচ্ছে, ততই সামনে আসছে একটি পুরোনো কিন্তু অমীমাংসিত ইস্যু। আর তা হলো- বিদেশে জব্দ হয়ে থাকা ইরানের বিপুল সম্পদ। সাম্প্রতিক যুদ্ধবিরতি ঘিরে ইসলামাবাদে অনুষ্ঠিত আলোচনা এই প্রশ্নকে নতুন মাত্রা দিয়েছে। তেহরান স্পষ্ট করেছে, জব্দ সম্পদ মুক্ত না হলে কোনো অর্থবহ আলোচনা সম্ভব নয়। ফলে এটি এখন কেবল অর্থনৈতিক নয়, বরং রাজনৈতিক আস্থা, কৌশলগত সমীকরণ এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা একটি প্রশ্নে পরিণত হয়েছে।

 

১৯৭৯: সংঘাতের সূচনা
ইরানের সম্পদ জব্দ হওয়ার ইতিহাস শুরু হয় ১৯৭৯ সালে ইসলামিক বিপ্লবের পর। তেহরানে মার্কিন দূতাবাসে জিম্মি সংকটের প্রেক্ষাপটে প্রেসিডেন্ট জিমি কার্টার ইরানকে ‘জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি’ ঘোষণা করে প্রায় ৮ বিলিয়ন ডলারের সম্পদ জব্দ করেন। এই পদক্ষেপ শুধু তাৎক্ষণিক রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া ছিল না; এটি আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞাকে একটি কার্যকর ভূরাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে।

 

এই ঘটনার পরপরই আন্তর্জাতিক ব্যাংক ও করপোরেশনগুলো ইরানের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করতে শুরু করে, যা দেশটির অর্থনীতিকে দ্রুত বিচ্ছিন্নতার দিকে ঠেলে দেয়।

 

আলজিয়ার্স চুক্তি: আংশিক মুক্তি
১৯৮১ সালে আলজিয়ার্স চুক্তির মাধ্যমে জিম্মিদের মুক্তির বিনিময়ে কিছু সম্পদ ছাড় দেওয়া হয়। তবে পুরো অর্থ ফেরত আসেনি। উল্লেখযোগ্য অংশ বিভিন্ন আইনি দাবি ও ক্ষতিপূরণের নামে আটকে রাখা হয়।

 

এই অভিজ্ঞতা ইরানের মধ্যে একটি দীর্ঘস্থায়ী অবিশ্বাসের জন্ম দেয়—বিশেষ করে পশ্চিমা শক্তিগুলোর প্রতিশ্রুতি ও আন্তর্জাতিক আইনি কাঠামোর নিরপেক্ষতা নিয়ে।

 


নিষেধাজ্ঞার বিস্তার ও সম্পদ বৃদ্ধি
পরবর্তী দশকগুলোতে ইরানের পারমাণবিক ও ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে নিষেধাজ্ঞা আরও কঠোর হয়। এর ফলে তেল বিক্রির আয়সহ বিপুল সম্পদ বিদেশি ব্যাংকগুলোতে জমা হলেও তা ব্যবহারের সুযোগ সীমিত হয়ে পড়ে।

 

বর্তমানে বিভিন্ন হিসাব অনুযায়ী, এই জব্দ সম্পদের পরিমাণ ১০০ বিলিয়ন ডলারের বেশি। বিশ্লেষকদের মতে, এই অর্থ ইরানের বার্ষিক জ্বালানি রপ্তানি আয়ের প্রায় তিন গুণ—যা একটি দীর্ঘদিনের নিষেধাজ্ঞাগ্রস্ত অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ।

 

কোথায় আছে এই অর্থ ?
ইরানের এই সম্পদ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে আছে এবং এর সুনির্দিষ্ট হিসাব পাওয়া কঠিন। বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চীনে অন্তত ২০ বিলিয়ন ডলার, ভারতে প্রায় ৭ বিলিয়ন, ইরাকে ৬ বিলিয়ন এবং জাপানে প্রায় ১.৫ বিলিয়ন ডলার আটকে আছে। এ ছাড়া কাতারে প্রায় ৬ বিলিয়ন ডলার, যা দক্ষিণ কোরিয়া থেকে স্থানান্তর করা হয়েছিল, সেটিও কার্যত অচল। ইউরোপে লুক্সেমবার্গে প্রায় ১.৬ বিলিয়ন এবং যুক্তরাষ্ট্রে সরাসরি প্রায় ২ বিলিয়ন ডলার জব্দ রয়েছে।

 

এই অর্থের বড় অংশই তেল বিক্রির আয়, যা আন্তর্জাতিক ব্যাংকিং ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতার কারণে দেশে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয়নি।

 

কাতার চুক্তি ও পুনরায় অচলাবস্থা
২০২৩ সালে বন্দি বিনিময় চুক্তির আওতায় দক্ষিণ কোরিয়ায় আটকে থাকা ৬ বিলিয়ন ডলার কাতারে স্থানান্তর করা হয়। তবে এই অর্থ কেবল মানবিক খাতে ব্যবহারের শর্তে দেওয়া হয়েছিল এবং প্রতিটি লেনদেনে মার্কিন অনুমোদন প্রয়োজন ছিল। পরবর্তীতে ২০২৪ সালের আঞ্চলিক উত্তেজনার পর সেই অর্থে ইরানের প্রবেশাধিকার আবার স্থগিত করা হয়, যা এই ইস্যুর অনিশ্চয়তা ও রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণের বিষয়টি আরও স্পষ্ট করে তোলে।

 

জেসিপিওএ: আশার জানালা, দ্রুত বন্ধ
২০১৫ সালে পারমাণবিক চুক্তি ইরানের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় ছিল। এতে ইরান কিছু সম্পদ ব্যবহারের সুযোগ পায় এবং আন্তর্জাতিক অর্থনীতিতে আংশিকভাবে ফিরে আসার সুযোগ তৈরি হয়।


কিন্তু ২০১৮ সালে ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসন চুক্তি থেকে সরে গিয়ে পুনরায় নিষেধাজ্ঞা আরোপ করলে সেই সুযোগও বন্ধ হয়ে যায়। ফলে ইরানের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি আস্থার সংকট আরও গভীর হয় এবং ভবিষ্যৎ যেকোনো আলোচনার ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়ে।

 

‘জব্দ সম্পদ’ কী এবং কেন ?
ফ্রোজেন অ্যাসেট বা জব্দ সম্পদ বলতে বোঝায় এমন অর্থ বা সম্পদ, যা কোনো দেশ, ব্যাংক বা আন্তর্জাতিক সংস্থা আইনি বা রাজনৈতিক কারণে ব্যবহার করতে দেয় না। সাধারণত নিষেধাজ্ঞা, আদালতের আদেশ বা আন্তর্জাতিক নিয়ম লঙ্ঘনের অভিযোগে এসব সম্পদ আটকে রাখা হয়। যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে বলা হয়, এসব সম্পদ জব্দ করার পেছনে নিরাপত্তা উদ্বেগ, পারমাণবিক কর্মসূচি এবং আঞ্চলিক কার্যকলাপ নিয়ে দীর্ঘদিনের আশঙ্কা কাজ করেছে।

 

তবে সমালোচকদের মতে, অনেক ক্ষেত্রেই এটি ভূরাজনৈতিক চাপ প্রয়োগের একটি কার্যকর উপায় হিসেবে ব্যবহৃত হয়, বিশেষ করে প্রতিদ্বন্দ্বী রাষ্ট্রগুলোর বিরুদ্ধে।

 

অর্থনীতিতে প্রভাব
দীর্ঘদিনের নিষেধাজ্ঞায় ইরানের অর্থনীতি ব্যাপক চাপে রয়েছে। তেল রপ্তানি কমেছে, বিদেশি বিনিয়োগ স্থবির হয়েছে এবং শিল্প খাতে আধুনিকায়ন বাধাগ্রস্ত হয়েছে। উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও মুদ্রার অবমূল্যায়ন সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রাকে কঠিন করে তুলেছে।

 

এই প্রেক্ষাপটে জব্দ সম্পদ ইরানের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রায় ১০০ বিলিয়ন ডলার দেশটির মোট দেশজ উৎপাদনের একটি বড় অংশের সমান। অর্থনীতিবিদদের মতে, এই অর্থ ছাড় হলে ইরান মুদ্রার স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ শক্তিশালী করতে এবং অবকাঠামো উন্নয়নে বিনিয়োগ বাড়াতে পারবে।

 

তেল, পানি সরবরাহ এবং বিদ্যুৎ খাতের মতো গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো উন্নয়নেও এই অর্থ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।


বিকল্প পথ: ক্রিপ্টো ও কৌশলগত অভিযোজন
নিষেধাজ্ঞার চাপে ইরান বিকল্প অর্থনৈতিক কৌশলও গ্রহণ করেছে। এর মধ্যে রয়েছে ক্রিপ্টোকারেন্সির ব্যবহার, যেখানে বিটকয়েন মাইনিংয়ের মাধ্যমে বৈদেশিক আয় অর্জনের চেষ্টা করা হয়েছে।

 

যদিও এটি মূল সমস্যার সমাধান নয়, তবে আন্তর্জাতিক ব্যাংকিং ব্যবস্থার বাইরে একটি সীমিত বিকল্প তৈরি করতে সহায়তা করেছে এবং নিষেধাজ্ঞার প্রভাব আংশিকভাবে কমিয়েছে।

 

হরমুজ প্রণালি ও নতুন সমীকরণ
সাম্প্রতিক উত্তেজনায় হরমুজ প্রণালির গুরুত্ব আবার সামনে এসেছে। বিশ্বে পরিবাহিত তেলের প্রায় ২০ শতাংশ এই পথ দিয়ে যায়, যা একে বৈশ্বিক জ্বালানি নিরাপত্তার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ করিডর বানিয়েছে।

 

ইরান এই কৌশলগত অবস্থানকে আলোচনায় চাপ প্রয়োগের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে, যা জব্দ সম্পদ মুক্তির প্রশ্নকে আরও গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে এবং কূটনৈতিক সমীকরণে নতুন মাত্রা যোগ করেছে।

 

ইসলামাবাদ আলোচনা ও অচলাবস্থা
১০ এপ্রিলের আগে ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাকের কালিবাফ স্পষ্টভাবে বলেন, আলোচনা শুরুর আগে জব্দ সম্পদ মুক্ত করতে হবে। যদিও কিছু প্রতিবেদনে আংশিক ছাড়ের ইঙ্গিত পাওয়া গিয়েছিল, যুক্তরাষ্ট্র তা অস্বীকার করে। ফলে আলোচনা অচলাবস্থায় পড়ে।

 

২২ এপ্রিল যুদ্ধবিরতির মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে এই ইস্যু আবার আলোচনায় আসবে বলে ধারণা করা হচ্ছে, যা ভবিষ্যৎ কূটনৈতিক পরিস্থিতিকে আরও অনিশ্চিত করে তুলেছে।

 

কূটনৈতিক বার্তা ও অনিশ্চয়তা
বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র যদি এই সম্পদ মুক্ত করে, তা হবে একটি গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক বার্তা—যা ইরানের ওপর চাপ কমানোর ইঙ্গিত দিতে পারে। এতে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও সম্পর্ক পুনরুজ্জীবিত হওয়ার সম্ভাবনাও রয়েছে।

 

তবে একই সঙ্গে অনিশ্চয়তাও রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের নীতিগত ধারাবাহিকতা নিয়ে প্রশ্ন থাকায়, যেকোনো সিদ্ধান্তই ভিন্নভাবে ব্যাখ্যা হতে পারে।

 

সংঘাতের বহুমাত্রিক বাস্তবতা
৪৭ বছরের এই অর্থনৈতিক সংঘাত দেখিয়েছে যে, জব্দ সম্পদের প্রশ্ন শুধু অর্থনৈতিক নয়; এটি ক্ষমতা, আস্থা এবং বৈশ্বিক রাজনীতির প্রতিফলন। ইরানের জন্য এটি জাতীয় সম্পদের পুনরুদ্ধারের লড়াই আর যুক্তরাষ্ট্রের জন্য এটি কৌশলগত চাপ প্রয়োগের একটি উপায়।

 

এই বাস্তবতায়, জব্দ সম্পদের ভবিষ্যৎ শুধু দুই দেশের সম্পর্কই নির্ধারণ করবে না; বরং এটি আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থার ন্যায্যতা ও বিশ্বাসযোগ্যতার ওপরও দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে।*


লেখক: ইরানের জাতীয় সম্প্রচার সংস্থায় (আইআরআইবি) কর্মরত সাংবাদিক