প্রিন্ট এর তারিখঃ শুক্রবার ০১ মে ২০২৬, ১৭ বৈশাখ ১৪৩৩
প্রকাশিত: ২০২৬-০৪-০২ ১০:০৫:১৭
২৮ ফেব্রুয়ারি খুব ভোরে ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আলী খমেনেয়িসহ শীর্ষ সামরিক কমান্ডারকে শহীদ এবং সকালের দিকে ১৬৭ জন স্কুল শিক্ষার্থীকে হত্যার মাধ্যমে শুরু হয় ইরানের বিরুদ্ধে ইসরায়েল-মার্কিন যুদ্ধ। পরের দিন বেলা সাড়ে দশটায় অফিসে ডিউটিরত অবস্থায় শক্তিশালী বিস্ফোরণের শব্দ শুনতে পাই। শব্দের তীব্রতা এতোটাই যে আতঙ্কে সবাই ছুটাছুটি করতে থাকে এবং মনে হলো ভবন মাথার ওপর ভেঙে পড়বে। কারণ আমাদের ভবনেও বোমা হামলা হতে পারে এমন আশঙ্কা তো ছিলই। আমরা দ্রুত ভবনের বাইরে গিয়ে ফাঁকা মাঠে অবস্থান করি। যুদ্ধের এমন অভিজ্ঞাতা আমার অতীতে কখনো ছিল না।
এরপর তেহরানসহ ইরানের অন্যান্য বড় শহরে গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় এখনো নিয়োমিত বোমা হামলা চালিয়ে যাচ্ছে আমেরিকা ও ইসরায়েল। প্রতিদিনই মাঝরাতে প্রচণ্ড বিস্ফোরণের শব্দে ঘুম ভেঙে যেত। দুই তিন কিলোমিটার দুরে বিস্ফোরণ ঘটলেও সেটার কম্পনে মনে হয় আমার বাসার জানালার গ্লাস ভেঙে পড়বে। আমার বাসার কাছেই তেলের বিশাল ডিপোতে বোমা হামলায় পুরো এলাকার আকাশ বাতাস দুষিত হয়ে যায়। একই সময়ে পুরো তেহরানের অন্তত ৬টি তেলের ডিপোতে হামলা হয় যাতে তেহরানকে বসবাস অযোগ্য করে তোলা যায়। কিন্তু অসময়ে হঠাৎ ভারি বৃষ্টি শুরু হওয়ায় আবহাওয়া পরিস্কার হয়ে যায়। আমার একটা ছোট ব্যাগে কিছু কাপড় চোপড়, , পানি, খাবার ও টাকা সবসময় রেডি থাকতো যাতে প্রয়োজনে ঘর থেকে বেরিয়ে পড়তে পারি।

এরপর ১৮ মার্চ তেহরান থেকে বাকুর উদ্দেশ্যে রওনা হই। বাংলাদেশ সরকার, তেহরান ও আঙ্কারায় অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাসের সহযোগিতায় আমি এবং ছোট ছেলে দুজনে ঢাকায় আসি। সব মিলিয়ে যাত্রী ছিল ১৮৬ জন। পুরো যাত্রাটি ছিল জাতিসংঘের অভিবাসন দফতরের তত্বাবধানে। তেহরান থেকে ৯টি বাস ১৮৬ জন যাত্রি নিয়ে ৯ঘন্টায় ইরান-আজারবাইজান সীমান্ত এলাকা ‘আস্তারা’ পৌঁছায়। রাত তখন একটা। কাছেই উত্তর ইরানের কাস্পিয়ান সাগরে আঞ্জালি বন্দরে একটু আগে বিমান হামলা হওয়ায় সীমান্ত হঠাৎ বন্ধ হয়ে যায়। ফলে সীমান্তে আমরা আটকা পড়ে সেখানেই একটি বড় হল রুমে কেউ দাঁড়িয়ে কেউ বসে রাত কাটাই। আর মহিলাদের জন্য কাছেই নামাজ ঘরে রাতে ঘুমানোর ব্যবস্থা করা হয়। আমি সারা রাত ঘুমাতে পারিনি। অর্থাৎ ঘুমানোর পরিবেশ ছিল না। পরের দিন খুব ভোরে আমি একাই অচেনা আস্তারা উপশহরের অলিগলি ঘুরে এলাকার সঙ্গে পরিচিত হলাম। যাত্রা পথের জন্য স্থানীয় ‘বারবারি’ নামে সদ্য তৈরি হওয়া কিছু গরম রুটি কিনলাম। স্থানীয়রা ফার্সি এবং আযারি-তুর্কি উভয় ভাষায় কথা বলে।
সীমান্তে ফিরে এসে ইমিগ্রেশনের কাজ শেষ করে ১৯ মার্চ বেলা ১২টায় সীমান্ত পেরিয়ে আজারবাইজানের ভিসা নিতে হয়েছে। সীমান্ত পার হওয়ার সময় ছোট্ট একটি খাল বা নদী। তার উপর ব্রিজ। ব্রিজের মাঝখানে দুই দেশের পতাকা। ব্রিজ সংলগ্ন ডান পাশে কাস্পিয়ান সাগর দেখা যায়। খুবই মনোরম পরিবেশ। পতাকার ওপাশে আযারবাইজান শুরু। ওপারে সেখানে স্বয়ং উপস্থিত ছিলেন তুরস্কে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত। তিনি আমাদের জন্য অসম্ভব পরিশ্রম করেছেন। দীর্ঘ সময় দাঁড়িয়ে থেকে ভিসার জন্য ব্যাংক কার্ড দিয়ে একে একে সবার জন্য ৪০ ডলার করে পে করেছেন। উনাকে বসার জন্য একটা চেয়ারও দেয়া হয়নি। এটা তাদের ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা। আমাদের রাষ্ট্রদূত মহোদয় ক্লান্ত বাচ্চাদের জন্য পুতুল উপহার দেন। তবে বাংলাদেশিদের দেশে ফেরার ব্যাপারে আজারবাইজান সরকার যথেষ্ট সহযোগিতা করেছে। আর তেহরানস্থ বাংলাদেশ দূতাবাসের কর্মকর্তারাও বাকুতে বিমানে ওঠা পর্যন্ত আমাদের সাথেই ছিলেন।
ভিসা ও পাসপোর্ট চেকিং শেষে ওপারে অপেক্ষমান নতুন বাসে উঠলাম। সেদিন আজারবাইজানে ছিল ঈদের দিন। বন্ধ বাসেই কেটে গেল ২৪ ঘন্টা। যাদের পাসপোর্ট ছিল না তাদের কাগজপত্রের জটিলতা নিরসন এই অপেক্ষার কারণ। আজারবাইজান অংশে মাত্র দুটি টয়লেট ছিল। তার যা অবস্থা সেটার বর্ণনা আর নাইবা দিলাম। ২৪ ঘন্টা সীমান্তে অবস্থান করার পর বাস রাজধানী বাকুর উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করে। পুরো পথ জুড়ে কাস্পিয়ান সাগর তীর ঘেঁষে রাজধানী বাকুতে পৌঁছলাম। ইরানের মতোই শহরটি সাজানো গোছানো। তেহরান থেকে রওনা দিয়ে সীমান্ত পার হয়ে বিমানবন্দর পৌঁছা পর্যন্ত পুরো সময়জুড়ে যাত্রীদের জন্য তিন বেলা খাবারের ব্যবস্থা ছিল।
পাঁচ ঘন্টা বাস জার্নির পর বিমানবন্দরে আমরা পৌঁছে যাই। আমরা সেখানে পৌঁছানোর আগেই বাংলাদেশ বিমান পৌঁছে গিয়েছিল। বিমানে পাঁচ ঘন্টার যাত্রা শেষে ২০ মার্চ রাত দুইটায় আমরা ঢাকায় পৌঁছি। সেখানে অপেক্ষায় ছিলেন বাংলাদেশ সরকারের বেশ কজন মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী যাদের মধ্যে ভিপি নুরও ছিলেন। তাদের সাথে করমর্দন করার পর আমাদেরকে বসিয়ে সরকারের কর্মকর্তারা কিছু কথাবার্তা বললেন এবং আমাদের আনার ক্ষেত্রে সরকারের ভূমিকা ও প্রচেষ্টার বিষয়টি তুলে ধরলেন। আমরা যাত্রীরাও সরকারের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করি। রাতের খাবারের ব্যবস্থা করে তারা আমাদেরকে বিদায় দেন। আমরা যখন বিমানবন্দর থেকে বের হই তখন ভোর পাঁচটা বাজে। মোট তিন দিনের যাত্রা। দেশে পৌঁছে রোজার ঈদ পেলাম। অর্থাৎ তিন দিনের যাত্রা পথে দুটি ঈদ পেলাম।
বাইরে অপেক্ষমান টিভি সাংবাদিকরা আমার যাত্রাপথের অভিজ্ঞতা জানতে চাইলে আমি সংক্ষেপে কিছু কথা বললাম।
একইসাথে টিভি চ্যানেলে এটাও বলেছিলাম আমাদের দেশের আলেম সমাজ, ইসলামি চিন্তাবিদ, কুরআনের তাফসিরকারোকরা, ওয়াজকারীরা, ইসলামি সংগঠন ও আন্দোলনকারীরা যেন ইরানের ধর্মীয় চিন্তাবিদদের সাথে কথা বলেন, তাদের সাথে ওঠাবসা করেন। ইরানি আলেমদের ধর্মীয় দর্শন, রাজনৈতিক দর্শন, সমাজ দর্শন, প্রতিরোধের চেতনা প্রভৃতি বিষয়ে তাদের চিন্তাভাবনার সাথে পরিচিত হওয়ার আহ্বান জানিয়েছিলাম। বাংলাদেশের ইসলামি চিন্তাবিদদের উদ্দেশ্যে বলেছিলাম ইরানিদের শক্ত ঈমান ও প্রতিরোধ শক্তির উৎস কোথায় সেটা জানার চেষ্টা করুন।
কিন্তু টিভি চ্যানেলগুলো আমার যাত্রাপথের অভিজ্ঞতার বিষয়টি প্রচার করলেও আমার বক্তব্যের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এই অংশটিকে প্রচার করতে দেখিনি কোথাও।
এটাকে বাংলাদেশের সাংবাদিকদের চিন্তাভাবনার দৈন্যদশা বলবো কিনা জানিনা।#
-ইরান প্রবাসী মোঃ রেজওয়ান হোসেন এর ওয়াল থেকে