প্রিন্ট এর তারিখঃ বৃহস্পতিবার ১৬ এপ্রিল ২০২৬, ২ বৈশাখ ১৪৩৩


ডি-এক্স কর্নার

ডয়চে ভেলের দিনগুলি ও ফারুক ভাই: এক আত্মিক বন্ধন

প্রকাশিত: ২০২৫-০৭-০২ ০১:২৬:০২

News Image

আবদুল্লাহ আল ফারুক ও আকবর হায়দার কিরন

-আকবর হায়দার কিরন
১৯৭৫ সাল। জার্মান বেতার ডয়চে ভেলে বাংলা ভাষায় অনুষ্ঠান সম্প্রচার শুরু করে। আমি তখন ইংরেজি বিভাগের একজন নিয়মিত শ্রোতা। সেই সুবাদে বাংলা বিভাগের নতুন উদ্যোগ সম্পর্কে আগেভাগেই জানতে পারি—এমনকি একটি চিঠিও পাই। বাংলা বিভাগের সূচনাকারীদের অন্যতম ছিলেন আবদুল্লাহ আল ফারুক ভাই, যিনি স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের একজন প্রথম সারির কণ্ঠসৈনিকও ছিলেন।

 

ফারুক ভাইয়ের বাবা তখন কুলাউড়ায় সার্কেল অফিসার ছিলেন, আর আমার সেজো ভাই কর্মরত ছিলেন শ্রীমঙ্গলে। সেই পারিবারিক সূত্রে ফারুক ভাইয়ের পরিবারের সঙ্গে এক আন্তরিক সম্পর্ক গড়ে ওঠে। তাঁর ছোট ভাই ডায়মন্ডের সঙ্গে আমার বন্ধুত্ব হয় এবং আমি তাঁদের বাসায় বেড়াতে যেতাম।

 

ফারুক ভাইয়ের সঙ্গে আমার প্রথম সাক্ষাৎ তাঁর ছোট ভাই, চক্ষু বিশেষজ্ঞ ডা. মামুন ভাইয়ের ফার্মগেটের বাসায়। পরে আশির দশকে একদিন ফারুক ভাই ও ডায়মন্ড আমার কুমিল্লার বরদইন গ্রামের বাড়িতে বেড়াতে আসেন। আমার আম্মা তাঁকে যেন আপন কারও মতোই গ্রহণ করেন। ফারুক ভাইয়ের আম্মাও আমাকে ভীষণ স্নেহ করতেন—সেই মমতা আজও হৃদয়ে অমলিন।

 

ওই সফরে তাঁরা দু’জন বাসে চড়ে এসে সারাদিন আমাদের বাড়িতে কাটালেন। বিকেলে পাশের গ্রাম জগন্নাথ দিঘীতে প্রিন্সিপাল বাচ্চু ভাইয়ের বাড়ি এবং আমার সহপাঠী শাহ আলমের খালাম্মার বাড়িতে একসঙ্গে যাই। সেদিন আমার বড় ভাই মিন্টু ভাই-ও বাড়িতে ছিলেন—সব মিলিয়ে দিনটি হয়ে উঠেছিল বিশেষভাবে স্মরণীয়।

 

এরপর ১৯৮২ সালের দিকে ফারুক ভাই ডয়চে ভেলে বাংলা বিভাগের প্রধান ভেগ মায়ার-কে নিয়ে ফেনীতে আমার বন্ধু বব দেবাশীষ দাস বাবলুর ‘ইন্টারন্যাশনাল রেডিও ক্লাব’-এর অনুষ্ঠানে অংশ নেন। ঢাকায় আমি ডয়চে ভেলের জন্য অনেক অনুষ্ঠান আয়োজন করি। তখন বাংলা বিভাগের একজন বিশেষ বিশ্লেষক হিসেবে কিছুদিন কাজ করার সুযোগও পাই এবং সম্মানীও পেয়েছিলাম—এটা ছিল আমার জীবনের এক গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায়।

 

প্রায় এক যুগ আগে ফারুক ভাই নিউ ইয়র্কে আসেন। সে সময় আমি তাঁর একটি বিশেষ সাক্ষাৎকার গ্রহণ করি, যা ইউটিউবে প্রকাশিত হয়। তাঁর অবসরের সময় ডয়চে ভেলের এক স্মৃতিচারণ অনুষ্ঠানে যখন তিনি আমার মতো একজন সাধারণ শ্রোতার কথা স্মরণ করেন—সেটা ছিল আমার জন্য এক অপার প্রাপ্তি, এক অবর্ণনীয় সম্মান।

 

গত বছর নিউ ইয়র্ক বইমেলার প্রাঙ্গণ থেকে তাঁর ও রোকেয়া হায়দার আপার সঙ্গে টেলিফোনে কথা হয়। ফোনের ওপার থেকেও ফারুক ভাইয়ের কণ্ঠে যে আন্তরিকতা, স্নেহ ও মমতা ভেসে আসছিল, তা যেন আমার হৃদয় ছুঁয়ে যায়।

 

এই মানুষটির সঙ্গে আমার সম্পর্ক কেবল রেডিওর তরঙ্গেই সীমাবদ্ধ ছিল না—ছিল আত্মার সংযোগে, আন্তরিকতায় এবং এক গভীর স্নেহের বন্ধনে।

 

আবদুল্লাহ আল ফারুক ভাই আমার জীবনের সেই সোনালী অধ্যায়ের অন্যতম উজ্জ্বলতম চরিত্র।