বৃহস্পতিবার ১২ মার্চ ২০২৬, ২৮ ফাল্গুন ১৪৩২

Logo
Add Image

জাতীয়

পটুয়াখালীর দুর্গম চরের দুরন্ত কিশোর থেকে ডাকসুর ভিপি, ভিপি থেকে দলীয় প্রধান অতঃপর মন্ত্রী

প্রকাশিত: ২০২৬-০২-১৮ ১০:১৫:৫৮

News Image

টাঙ্গাইল দর্পণ অনলাইন ডেস্ক:
পটুয়াখালীর দূর্গম এক চরের বাসিন্দা নুরুল হক নুর। বর্তমানের এই আধুনিক যোগাযোগ ব্যবস্থার যুগেও জেলা শহর থেকে নিজ বাড়ি পৌছুতে সময় লাগে ৫/৬ ঘন্টা। পাড়ি দিতে হয় বিক্ষুদ্ধ আগুনমুখা নদী অথবা বুড়াগৌরঙ্গ নদ। এখোনা সেখানে গড়ে ওঠেনি সরাসরি যোগাযোগ ব্যবস্থা।

 

পটুয়াখালীর গলাচিপা উপজেলার দুর্গম চরের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন ইউনিয়ন চরবিশ্বাসের এক নিন্ম মধ্যবিত্ত পরিবার থেকে উঠে আসা যুবক নুরুল হক নুর। ভিপি নুর নামে যিনি সর্বাধিক পরিচিত। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে পটুয়াখালী-৩ (গলাচিপা-দশমিনা) আসন থেকে সংসদ সদস্য (এমপি) নির্বাচিত হয়েছেন। চরের সেই দূরন্ত নুরুল হক নুর আজ বিকেলে প্রতিমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিয়েছেন। তার শপথ গ্রহনের মধ্য দিয়ে নতুন এক ইতিহাসের স্বাক্ষী হলো পটুয়াখালীর চরাঞ্চলের বাসিন্দারা।

 

৩৪ বছর বয়সী এই যুবক বিজয়ের ক্ষেত্রে অসংখ্য বাধাবিপত্তিকে শক্ত হাতে মোকাবিলা করে আজ এ পর্যন্ত এসে পৌছেছেন।

 

নুরুল হকের বাবা ইদ্রিস হাওলাদার চরবিশ্বাস ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) সাবেক সদস্য। নুরের বয়স যখন আড়াই বছর, তখন তাঁর মা নিলুফা বেগম মারা যান। তিন ভাই ও পাঁচ বোনের মধ্যে নুর চতুর্থ। চরবিশ্বাসে প্রাথমিক ও স্থানীয় জনতা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে সপ্তম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করে গ্রাম থেকে গাজীপুরের কালিয়াকৈর উপজেলার গোলাম নবী মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে অষ্টম শ্রেণিতে ভর্তি হন নুর।

 

২০১০ সালে এসএসসি পাসের পর তিনি ২০১২ সালে রাজধানীর উত্তরা হাইস্কুল অ্যান্ড কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করেন। ২০১৩-১৪ শিক্ষাবর্ষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগে ভর্তি হন। বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে তিনি কিছু সময় ছাত্রলীগের রাজনীতির সাথে জড়িত ছিলেন।

 

২০১৯ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) নির্বাচনে সহসভাপতি (ভিপি) নির্বাচিত হন নুরুল হক। এই নির্বাচনের মাধ্যমেই তিনি দেশব্যাপী পরিচিতি লাভ করেন। নুরুল হত নুর থেকে তিনি হয়ে ওঠেন ভিপি নুর।

 

২০১৮ সালে সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদের ব্যানারে কোটা সংস্কার আন্দোলনের নেতৃত্ব দেন নুরুল হক। একই বছরে অর্থনীতিবিদ রেজা কিবরিয়া ও নুরুল হকের নেতৃত্বে বাংলাদেশ গণ অধিকার পরিষদ গঠনের ঘোষণা দেওয়া হয়। ২০২১ সালের ২৬ অক্টোবর ঢাকার পল্টনে দলটির নাম আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করা হয়। পরে ২০২৩ সালের ১০ জুলাই দলটির একাংশের কাউন্সিলে নুরুল হক সভাপতি নির্বাচিত হন।

 

২০১৯ সালের ২২ ডিসেম্বর ভারতের নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন ও জাতীয় নাগরিক নিবন্ধন (এনআরসি) বিরোধী আন্দোলনে সংহতি জানিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজু ভাস্কর্যের পাদদেশে আয়োজিত সমাবেশের নেতৃত্ব দেন নুরুল হক। এ সময় মুক্তিযুদ্ধ মঞ্চের নেতা-কর্মীদের সঙ্গে সংঘর্ষে তিনি ও তাঁর সহকর্মীরা আহত হন। এ ঘটনায় ২৪ ডিসেম্বর শাহবাগ থানায় মামলা হলে তাঁর কয়েকজন সহকর্মী গ্রেপ্তার হন।

 

২০১৯ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত টানা কয়েকটি আন্দোলনে নুরুল হক প্রায় সাতবার হামলার শিকার হন। সর্বশেষ ২০২৫ সালের ২৯ আগস্ট জাতীয় পার্টির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে অবস্থান কর্মসূচিতে অংশ নিতে গিয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে গুরুতর আহত হন এবং তাকে বিদেশে চিকিৎসা নিতে হয়। এর আগে ২০২৪ সালে কোটাবিরোধী আন্দোলনে গ্রেপ্তার হয়ে পাঁচ দিনের রিমান্ড ও কারাভোগ করেন। ২০২৩ সালে ছাত্র অধিকার পরিষদের সমাবেশে টিএসসি এলাকায় ছাত্রলীগের হামলায় আহত হয়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা নেন তিনি।

 

এ ছাড়া ২০১৯ সালের ১৪ আগস্ট ঈদ উপলক্ষে নিজ বাড়িতে গেলে স্থানীয় আওয়ামী লীগের কর্মীদের হামলায় গুরুতর আহত হন তিনি। এ ছাড়া ডাকসু নির্বাচনকালে রোকেয়া হলের প্রভোস্ট লাঞ্ছিত ও ভাঙচুরের অভিযোগে তাঁর বিরুদ্ধে মামলা হয়। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নিতে জমা দেওয়া হলফনামা অনুযায়ী, নুরুল হকের বিরুদ্ধে এ পর্যন্ত ১৫টি মামলা হয়েছে। তাঁর ছোট ভাই আমিনুল ইসলাম নুর দাবি করেন, এ পর্যন্ত তাঁর ভাই ২৮ বার হামলার শিকার হয়েছেন।

 

ব্যক্তিগত জীবনে নুরুল হক বিবাহিত। তাঁর স্ত্রী মারিয়া আক্তার একটি বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেন। তাঁদের সংসারে দুই মেয়ে ও এক ছেলে রয়েছে।

 

নুরের বাবা ইদ্রিস হাওলাদার (৮০) জানান, আশির দশকে লঞ্চডুবিতে তাঁর দুই মেয়ে মারা যায়। পরে নব্বইয়ের দশকে নুরের মা নিলুফা বেগমের মৃত্যু হয়। এত শোকের মধ্যেও তিনি নুরকে ঢাকায় পড়াশোনার ব্যবস্থা করেন। স্বপ্ন ছিল ছেলে চিকিৎসক হবে। রাজনীতিতে যুক্ত হয়ে ছেলে যখন হামলা-মামলার শিকার হয়ে কারাগারে যেতেন, তখন অনেক রাত তিনি ঘুমাতে পারেননি। তার ছেলে এমপি বা মন্ত্রী হবে তা কোন দিন কল্পনায়ও করেন নি তিনি। তবে ডাকসুর ভিপি হওয়ার পর তার ছেলে যে কিছু একটা হবে তা তিনি উপলব্ধি করতে পারছিলেন। ছেলে মন্ত্রী হওয়ায় আল্লাহর কাছে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে তিনি বলেন নুর সৎ ভাবে তার দায়িত্ব পালন করবেন এটাই তার কাছে বাবা হিসেবে তার চাওয়া।
 

Logo
Logo





Logo

আরো পড়ুন

Logo

সম্পাদক : আবু তাহের

© ২০১৪-২০২৫ টাঙ্গাইল দর্পণ, অনলাইন নিউজ পেপার ২৪/৭