বৃহস্পতিবার ১২ মার্চ ২০২৬, ২৮ ফাল্গুন ১৪৩২
প্রকাশিত: ২০২৫-০৭-৩০ ১৯:২৬:০২
জুয়েল রানা, সখীপুর (টাঙ্গাইল) সংবাদদাতা:
পৃথিবীতে সবচেয়ে নির্মম চিত্র যদি কিছু থাকে, তবে তা পিতার কাঁধে সন্তানের লাশ বহন করা। এই হৃদয়বিদারক চিত্রই দেখা গেল টাঙ্গাইলের সখীপুর উপজেলার জামাল হাঁটকুড়ায়।
মাত্র দুই বছর আগে পরিবারের হাল ধরতে সৌদি আরবে পাড়ি জমিয়েছিলেন আরিফ হোসেন (১৮)। স্বপ্ন ছিল ছোট সংসারে একটু স্বচ্ছলতা আনা, মায়ের মুখে হাসি ফোটানো, ভাই-বোনদের ভালো ভবিষ্যতের পথ দেখানো। প্রবাস জীবনও ভালো চলছিল। কিন্তু ভাগ্যের নির্মমতায় সে স্বপ্ন আর পূরণ হলো না। গত ১৮ জুলাই স্টোক করে আরিফ। মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করে শেষ পর্যন্ত হেরে যান তিনি।
আরিফের বাবা লাল মিয়া দীর্ঘ ১২ বছর ধরে একই দেশে কাজ করছেন। ছেলের স্টোকের খবর পেয়ে ছুটে চলেন সন্তানের কাছে। কিন্তু পৌঁছানোর আগেই ছেলের মৃত্যুর সংবাদ তার বুক ছিঁড়ে দেয়। প্রবাসের কঠোর বাস্তবতায় বেঁচে থাকা মানুষটার চোখে তখন শুধুই অন্ধকার।
মৃত্যুর ১২ দিন পর, বুধবার (৩০ জুলাই) ভোর সাড়ে ৫টায় ছেলের নিথর দেহ নিয়ে ঢাকায় পৌঁছান পিতা লাল মিয়া। নিজ হাতে সেই সন্তানকে বহন করে নিয়ে এসেছেন বাড়ির পথে, যেখানে একদিন খুশি মুখে বিদায় জানিয়েছিলেন সবাই।
সন্তানের লাশ বুকে করে বাড়ি ফেরার এই যাত্রা যেন এক জীবনের শ্রেষ্ঠ ট্র্যাজেডি। সেই ছেলেই, যাকে আঙুল ধরে হাঁটতে শিখিয়েছিলেন বাবা, আজ তাকেই তিনি কবরস্থ করবেন- এ কেমন ভাগ্য?
জামালহাঁটকুড়া গ্রামের আকাশ যেন ভারী হয়ে উঠেছিল কান্নার শব্দে। মা ছেলের নিথর দেহ দেখে বারবার মূর্ছা যাচ্ছিলেন। ভাই-বোন আর আত্মীয়-স্বজনের আহাজারিতে কান্না চাপতে পারেননি প্রতিবেশীরাও। গ্রামের প্রতিটি কোণ যেন এক শোকাবহ বিষাদের চাদরে মোড়ানো।
জীবনের পড়ন্ত বেলায়, প্রবাসী লাল মিয়া যখন আশা করেছিলেন ছেলের কাঁধে ভর করেই হয়তো একদিন শেষ বয়সের আশ্রয় মিলবে, এখন বাস্তবতা তাকেই ছেলেকে কাঁধে করে কবরস্থানে নিয়ে যেতে বাধ্য করল।
বিষয়টি নিশ্চিত করেই উপজেলার সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান সিকদার মু. ছবুর রেজা বলেন, আরিফ আমার গ্রামের ছেলে। দুই ভাই এক বোনের মধ্যে আরিফ ছিলো বড়। এমন মৃত্যু সত্যি বেদনাদায়ক। তিনি প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের মাধ্যেমে অনুরোধ জানান, আরিফের কর্মরত কোম্পানি যেন আর্থিকভাবে তার পরিবারকে সহযোগিতা করে সে ব্যাপারে উদ্যোগ নেওয়ার।
বুধবার বাদ যোহর জামালহাঁটকুড়া গ্রামে জানাজা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয় প্রবাসী আরিফ হোসেনকে।
বাবার বুকের কান্না, মায়ের নিঃশব্দ চিৎকার আর আরিফের মৃত্যু যেন শুধু এক পরিবারের নয়, পুরো এলাকার বেদনার নাম হয়ে উঠেছে।